প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর
প্রতিরোধে বীর
ভারত-সন্তান
তমোঘ্ন নস্কর
পর্ব ২: সোমনাথ মন্দিরের চিতা
পূর্ব দিকের আকাশে তখন একটুখানি লাল ফোঁটা। ঝাপসা মায়াঘেরা
অন্ধকার। স্নান সারলেন ওঁরা। বার বার মনে পড়ছে, স্ত্রী’র
চাঁদপানা মুখখানি।
আর হয়তো কোনওদিন দেখা হবে না ওই শ্রীমুখখানি।
বার বার মনে পড়ছিল সেই স্বয়ংবরসভার কথা কিন্তু বেশি ভাবনা-চিন্তার অবকাশ হল না।
মন্দিরের ঘণ্টা জানিয়ে দিল বাবা সোমনাথের ধ্যান ভঙ্গ হয়েছে।
লিঙ্গাভিষেক সেরে উঠে দাঁড়ালেন
আড়াইশোজন বীর, তাঁরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বাবা সোমনাথের কাছে মনে মনে প্রার্থনা
করলেন,
চোখের পাতা বন্ধ না-হওয়া অবধি তাঁরা যেন মন্দিরশীর্ষের
গেরুয়া ধ্বজ উড়তে দেখে...
আরব সাগরে তৈরি হওয়া ভীষণ ঝঞ্ঝার
মতো আছড়ে পড়লেন সেই আড়াইশোজন। সম্মুখে পর্বতের ন্যায় বিশাল আলাউদ্দিন খিলজির
বাহিনী। নেতৃত্বে স্বয়ং ভ্রাতা উলুঘ খান ও খান-ই-জাহান জাফর খান। এ যুদ্ধ জেতা
অসম্ভব কিন্তু তবুও তাঁরা লড়লেন।
যুদ্ধ শুরুর আগে হেসেছিলেন জাফর
খান,
এই ক’জনকে তো তাঁর হাতিরাই পায়ের তলায় পিষে ফেলতে পারে।
কিন্তু জানতেন না,
তাঁদের বক্ষমধ্যে গিরের সিংহ বাস করে। তাঁরা আছড়ে কামড়ে
তছনছ করে দিল সেই সৈন্যবাহিনীকে। সারাটা দিন কী ভীষণ লড়াই লড়ে গেল তাঁরা! প্রায়
সাত সহস্রের মুখে আড়াইশত!
গোধূলিতে যখন আরব সাগরের দিক থেকে
পাখিরা ফিরে আসছে,
তখন স্তিমিত হয়ে এল অস্ত্রের ঝনঝনানি। আর-একটু পর বাবা
সোমনাথের মন্দিরে যখন সন্ধ্যারতি হচ্ছে, পরম শান্তিতে
ভূমি নিলেন আড়াইশোজনের শেষ বীরটি। বীর হামিরদেব গোহিল, বয়স মাত্র ষোলো।
***
সন ১২৯৯, তার আগের বছরই
আলাউদ্দিন খিলজির সুলতান বাহিনী মোঙ্গলদের বাধা দিতে গিয়ে দুর্দান্ত ক্ষয়ক্ষতির
সম্মুখীন হয়েছে। অবস্থা এমনই যে, এইবার আটকানো গেলেও, পরেরবার মোঙ্গলরা এলে সেই ভীষণ যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে
নাভিশ্বাস উঠবে। তাই চালাও লুটপাট। সমৃদ্ধশালী গুজরাটের দিকেই নজর গেল। গজনির
মামুদ এর আগেও গুজরাট থেকে প্রভূত সোনাদানা সেঁচে নিয়ে গেছেন। আবার গুজরাট নিজেকে
গড়ে তুলেছে স্বর্ণসম্ভারে।
***
আর্থিলার গোহিল রাজবংশের সিংহাসনে তখন রাজা ভীমজি গোহিল। তাঁর
সুশাসনে অখণ্ড শান্তি বিরাজ করছিল গোহিলওয়াড়ে।
তিন সন্তানকে রাজত্ব ভাগ করে
দিয়েছেন। তাঁদের সুশাসনে দৃঢ় ও সংঘবদ্ধ হয়েছে রাজ্য। কনিষ্ঠ পুত্রের বিবাহ দিয়ে
দিয়েছেন। সব মিলিয়ে অনন্ত সুখের সময়।
***
চার সহস্র যোদ্ধার ছোট্ট সেনাদলটা ছুটে চলেছে তির বেগে, সম্মুখে হামির আর তাঁর অভিন্ন হৃদয় কয়েকজন বন্ধু।
বাসর রাতের পরে এমন ভয়াবহ রাত আসবে, তা ভাবতেও পারেননি হামির। বিবাহিত জীবন একটু গুছিয়ে
নেওয়ার আগেই দুঃসংবাদটা এসেছিল। সুরতের দিক থেকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসছে সুলতানের
সৈন্য।
আলাউদ্দিন খিলজির এই বাহিনীর সঙ্গে
সকলেই পরিচিত। অজস্র পঙ্গপালের মতো ঘোড়সওয়ার। সুশিক্ষিত শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈন্যরা থাকে
পশ্চাতে। এই দ্রুতগতিসম্পন্ন ঘোড়সওয়ারদের, যুদ্ধব্যবসায়ীদের লক্ষ্য লুণ্ঠন করে
সুলতানের কোশ ভর্তি করা। সুরত অবধি সকল গ্রাম উজাড় করে দিয়েছে তারা।
এখন তাদের লক্ষ্য প্রভাসখণ্ড!
সোমনাথ মন্দিরের অতুল ঐশ্বর্য তাদের চোখ টেনেছে বার বার। আরব সাগরের একেবারে
মাঝখানে দাঁড়িয়েও দেখা যায় তার সুউচ্চ গর্বোদ্যত সূর্যচুম্বিত শীর্ষ! তার ভীষণ ঘণ্টাধ্বনি
পবিত্র নাদের মতো ছড়িয়ে পড়ে যোজন যোজন দূরের গ্রামগুলিতে... বিজিত জাতির এ গর্ব
জয়ী রাজার সহ্য হবে কেন?
কৃষ্ণবর্ণের সুবিশাল খণ্ডটি যেন শিবের চন্দ্রহাস! বিপুল ওজন
নিয়ে তীব্র গতিতে ছত্রাকার করে চলেছে বিপক্ষ দলের সেনাবাহিনীকে। তার অধিকারী
মধ্যবয়সি মানুষটা যেন সাক্ষাৎ নন্দী অবতার। বৃষস্কন্ধ, শালপ্রাংশু, মহাভূজ...
দাদাজি ভেগড়াজি ভিল।
উল্টোদিকে সুলতানের ছাউনিতে তখন
দিনশেষে শকুনেরা নেমে আসছে। এই প্রথম উলুঘ খান প্রমাদ গুনলেন! এক প্রাদেশিক ভিল
রাজা,
তাঁর এত বীরত্ব! ভেবেছিলেন, কেউ খবর পাওয়ার আগেই বিনা
বাধায় সোমনাথ মন্দিরের সম্মুখে উপস্থিত হবেন। সামনে দুর্গপ্রাকারের দরজাটি
অনায়াসে জয় করে নেওয়া যাবে।
কিন্তু এখন নিজের পঞ্চদশ সহস্র
যোদ্ধার সম্মুখভাগে কেবল শকুনের উল্লাস। মামুদের ফিরে যাওয়ার পর সোমনাথের মন্দির
ঘিরে বহরে ছোটো কিন্তু সুদৃঢ় দুর্গপ্রাকার গড়ে তুলেছে এরা। চর মারফত জেনেছিলেন, সামান্য
স্থাপত্য কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা ভীষণ হয়েই প্রতিভাত হল...
এরই মধ্যে টের পেলেন আর-একটি
বিরাট সেনাদল এসে পৌঁছেছে কেল্লায়। দূরবিনে চোখ রেখে অবাক হয়ে গেলেন উলুঘ, হামিরজি গোহিল! এই বালকের সদ্য বিবাহ হয়েছে।
এই বালককে ডরায় তাঁর বাহিনী, আলাউদ্দিন খিলজির বাহিনী। প্রত্যুৎপন্নমতি, ক্ষিপ্র এই বালক অল্প কয়েকদিনের মধ্যে নিজের গোরিলা
বাহিনীকে নিয়ে তাদের সীমান্তবর্তী কিল্লাদারদের নাস্তানাবুদ করে দিয়েছে। চোয়াল
শক্ত হল,
এ লড়াই সহজ হবে না।
নবপরিণীতা বধূকে ছেড়ে যে যুদ্ধে আসে, তার আর যাই হোক মৃত্যুভয় নেই। সোমনাথ তুমি সত্যিই দেবতা, না হলে এমনি করে মানুষ তোমার জন্য প্রাণ দেয় না।
দাদাজি ভেগড়াজি ভিল
উপর থেকে সমানে পাথর আর তিরবৃষ্টি। তার মধ্যে ছোট্ট ছোট্ট
তিনটি টুকরি নিয়ে সাঁড়াশি গোরিলা আক্রমণ! ভাগ্যিস শুধু ভাড়াটে সৈনিক নয়, সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী ও জাফর খানকেও এনেছিলেন। না হলে...
লাগাতার চারদিন ধরে যুদ্ধ চলছে। দ্বিতীয়
দিনে দেহ রেখেছিলেন ভেগড়াজি। ভীম-স্কন্ধ সেই মানুষটি পতনের পূর্বে সুলতানের ত্রি-সহস্র
সৈন্যকে ক্ষয় করে দিয়ে গেছে।
উলুঘ ভেবেছিলেন, দমে যাবে ওই বালক। কিন্তু বালক যেন বনের চিতাবাঘ! গোহিল
রাজের কথা অনেক শুনেছেন কিন্তু এই বালক সে-সবের উপরে থাকবে!
চিতার ন্যায় ক্ষিপ্র আর বাজের
ন্যায় তীক্ষ্ণ তার নজর। কিছুই সে-নজর এড়ায় না। গোপন সুড়ঙ্গ কাটার চেষ্টায় জল
ঢেলে দিয়ে সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ করেছে। রাতের গভীরে, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কালো কাপড়ে গা ঢেকে কেল্লার প্রাকারের কাছাকাছি চলে
এসেছিল একটা সৈন্যদল। কীভাবে যেন ঠিক বুঝে গেছে! গরম তেল ঢেলে সেই প্রচেষ্টাও
ব্যর্থ করেছে।
***
সপ্তম দিন, দূরবিনে চোখ রেখে
বসেছিলেন উলুঘ। সেই বালক আজও একই রকম বীরবিক্রমে লড়াই করে চলেছে। অথচ সে জানে
তিনটি ভীষণ প্রাণঘাতী আঘাত রয়েছে তার পিঠে! তা সত্ত্বেও এমন লড়াই, সুলতানের
সৈন্যবাহিনী অর্ধেক হয়ে গিয়েছে।
জাফরকে নেতৃত্ব নিয়ে নামতে
হয়েছে জঙ্গের ময়দানে। লুটপাট করতে এসে এমন ভীষণ প্রতিরোধের মুখে এই প্রথম পড়ল
সুলতানের বাহিনী। অবশ্য তাঁর অভিজ্ঞতা বলে, এ জঙ্গের আয়ু
আর বেশি দিনের নয়। ক্রমশই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে উল্টোদিকে সৈন্যবাহিনী।
সমুদ্রের দিক থেকে অর্ধচন্দ্রাকারে ঘিরে নিয়েছেন মন্দিরকে। প্রতিরোধের দিক হতে, তির ও প্রস্তরের ঘনত্ব ক্রমশই কমে আসছে। তবুও এই অবস্থাতেও, এই বালক এবং তার বন্ধুরা দিচ্ছে না তাদের সঠিক অবস্থান ও
সৈন্যসংখ্যা।
***
নবম দিনে মাত্র আড়াইশোজন মুখোমুখি হল সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির
অবশিষ্ট অথচ সুবিশাল বাহিনীর। নাহ্, কেল্লার প্রতিরোধ বলতে আর কিছুই নেই, এবার কেবল মুখোমুখি সংঘাত।
সবাই আজ শেষবারের মতো প্রণাম করছে
শ্রীসোমনাথকে। শেষবারের সুরভিত অষ্টগন্ধা ও চন্দনের লেপন নিয়েছে সর্বশরীরে। ভূমাকে
চুম্বন করে,
এক-একজন একশতজনের বল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মৃত্যুদেবতার
মহড়ায়।
যতক্ষণ না সোমনাথের মন্দিরে
সন্ধ্যারতি সম্পন্ন হল ততক্ষণ অবধি ক্ষুদ্র বাহিনীটা আটকে রাখল সুলতানের বিশাল
সৈন্যবাহিনীকে। মন্দিরে শঙ্খধ্বনি শেষ হল আর বিরাট খণ্ডখানা ঝন ঝন শব্দ তুলে খসে
পড়ল সেই বালকের হাত থেকে। পতন হল ইতিহাসের এক বিস্ময় বীর যুবরাজ হামিরজি গোহিলের...
ইতিহাস তেমনভাবে মনে রাখতে চায়নি
হামিরজি,
ভেগড়াজিদের আত্মবলিদানকে। কিন্তু সোমনাথ? তিনি তো পিতা, তিনি কী করে ভুলে যাবেন তাঁর সন্তানদের, যাঁরা
তাঁর সম্মান রক্ষার্থে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। তাই প্রবৃদ্ধ সোমনাথ তাঁর
বক্ষে ধরে রয়েছেন সেই যুদ্ধের ইতিহাস আর হামিরজির সেই স্মৃতিসৌধ।
এ লেখা সেই মহৎ আত্মার প্রতি
একটুকু স্মৃতিতর্পণ।
______________________________________________________________________________
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বটি পড়ুন:
প্রথম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন