জঙ্গল - প্রোজ্জ্বল পাল

 

জঙ্গল

 

প্রোজ্জ্বল পাল

 

 

 

 আমরা দাদুবাড়ি যাচ্ছি। আমার দাদুবাড়ি বিক্রমপুর। এমনিতে ট্রেনে করে যেতে হয়, কিন্তু আমাদের সাথে জেঠুও যাবে বলে আমরা গাড়ি করে যাচ্ছি। আমার নাম অর্ক মুখার্জী। বড় নাম অনুস্মিত মুখার্জী। আমার ডানপাশে আমার বাবা, আর বাবার ডান পাশে আমার মা। বাবা মাঝের সিটে বসতে চায় নি, সামনে বসতে চেয়েছিল, কিন্তু জেঠু সামনে বসবে বলে মা বাবাকে এখানে বসতে বলেছে। আমরা সকালে আটটা সতেরোয় গাড়িতে উঠেছি, এখন বাজে নটা তিন (আমি এত পারফেক্ট টাইম বলতে পারছি কারণ আমি দাদুবাড়ি যাওয়া উপলক্ষে ঘড়িটা পরার পারমিশন পেয়েছি)। বাবা বলেছে বিক্রমপুর পৌঁছতে পৌঁছতে বারোটা বাজবে। আমার না, ঘড়ির। হিহি।

      ও বলা হয় নি, আমার দাদু মারা গেছে তাও আমরা ওই বাড়িটাকে দাদুবাড়িই বলি। আমার দাদু মারা গেছে এক মাস হল। দাদু মারা যাওয়ার সময়ে আমায় মা বিক্রমপুরে যেতে দেয় নি, তখন আমার এক্সাম চলছিল তো। অবশ্য আমাদের ফ্ল্যাটে দাদুর যে আরবিচুয়ারী হয়েছিল সেখানে আমি রিসাইটেশন করেছি। আমি চুপিচুপি বলে রাখি, আমি জানি যে দাদু মারা যাওয়ার পর দাদুবাড়ি যাচ্ছি এই ব্যাপারটা নিয়ে আনন্দ পাওয়া উচিত না, কিন্তু দাদুবাড়ি যাচ্ছি ভেবেই না আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। আর হাইওয়ে তে চারপাশে এত গ্রীন ফিল্ড দেখে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। কেমন একটা সামার ভ্যাকেশন টাইপ ফিলিং আসছে।

আচ্ছা আমি আর একটা জিনিস জানি। স্যরী, এটা কাউকে বলা উচিত না, কারণ আমি এটা কাল রাতে বাবা মা যখন ভেবেছে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, আর আমার এক্সাইটমেন্টে ঘুম আসছিল না, তখন লুকিয়ে লুকিয়ে শুনে নিয়েছি। সেটা হল দাদু নাকি উইল করে দাদুর সমস্ত প্রপার্টি জঙ্গল করে দিতে বলে গেছে। দাদুর উকিল নাকি বাবা, জেঠু, পিসি সবাইকে কল করে জানিয়েছে। জঙ্গল করে দিতে বলে গেছে ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। মা-ও বাবা বলামাত্র বলে উঠেছিল,’মানে? জঙ্গল করে দিতে হবে মানে?’

তারপর বাবা বুঝিয়েছিল, যে দাদু নাকি উইল করে গেছে যে দাদুর মৃত্যুর পর বিক্রমপুরের বাড়িটা পুরো ভেঙে ফেলা হবে। আর পুরো যতটা জমি আছে পুরোটা জুড়ে একটা জঙ্গল তৈরী করা হবে। দাদু নাকি সব ইনস্ট্রাকশন দিয়ে গেছে কীভাবে জঙ্গল তৈরী করা হবে। আর তিন নাতি, মানে আমি, শাম্বদা আর দিয়াদিদির জন্য নাকি তিনটে চিঠি রেখে গেছে দাদু।

এরপর মা বাবা কী নিয়ে কথা বলেছে আমি ভালো করি শুনিনি। বাবা শুধু একবার চেঁচিয়ে উঠেছে,’এই সম্পত্তিতে আমাদের সবার অধিকার আছে। জঙ্গল করে দেবে বললেই তো হল না।’ আমি সেটা শুনেছি। আমি বাবা মা চেঁচামেচি করলে শুনিনা। ম্যাম বলেছে গুড কিডরা মা বাবার ফাইটের মাঝে কখনো আসে না। আমি গুড কিড। তাই আমি দাদু আমায় চিঠিতে কী কী লিখতে পারে সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি।

এখন আমি আবার চিঠিটা নিয়ে ভাবব। খুব আশ্চর্যের কথা আমার না দাদুর মুখটা ক্লিয়ার মনে পড়ছে না, শুধু দাদুর সাদা দাড়িটা, কাঠের টেবিলের ওপর রাখা দাদুর মৌরীর কৌটোটা মনে পড়ছে, আর দাদুর চটিদুটো দেখতে পাচ্ছি খাটের পাশে কার্পেটে রাখা। দাদু মারা যাওয়ার সময়ে তো আমি দাদুকে দেখতে পাই নি, আমার ‘দাদু মারা গেছে’ ভাবলেই খালি চোখে ভাসে সেই যে আগেরবার যখন গেছিলাম আমি কাঠবিড়ালীকে বাদাম খাইয়ে সেটা দাদুকে বলতে এলাম আর দেখলাম দাদু ঘুমোচ্ছে, দাদুর সাদা সাদা নরম দাড়িগুলো ফ্যানের হাওয়ায় উড়ছে, আর দাদুর চোখের মণিটা একদম শান্ত, সেই ছবিটা। আমি চোখ বন্ধ অবস্থায় দাদুর চোখের ওপর হাত দিয়েছিলাম, মণিটা কেমন চুপটি করে ছিল। সেবার চলে আসার আগের দিন যখন বাবা আর মায়ের খুব ফাইট হল, আর আমাকে দাদু কোলে করে নিজের খাটে নিয়ে এল, দাদু প্রমিস করেছিল পরদিন নৌকায় করে ঘুরতে নিয়ে যাবে। কিন্তু পরদিন তো আমরা চলে এলাম। আর নৌকায় চড়া হল না। চিঠিতে দাদু নিশ্চই মহাদেবকাকাকে আমায় নৌকা চড়ানোর কথা লিখে রেখে যাবে।

জেঠু বামনগাছি বলে একটা জায়গা থেকে গাড়িতে উঠে এল। আমি লক্ষ করছি বাবা আস্তে আস্তে জেঠুর মত দেখতে হয়ে যাচ্ছে, আর জেঠু দাদুর মত দেখতে হয়ে যাচ্ছে। এভাবে আমিও একদিন বাবা হয়ে যাব, আর শাম্বদাদা জেঠু হয়ে যাবে। হিসেব মত, তখন আর কেউ দাদু হবে না। আচ্ছা বলে রাখি, শাম্বদাদার পড়া আছে, তাই জেঠুমা বিকেলে শাম্বদাদাকে নিয়ে আসবে। আর পিসিরা তো চলে এসেছে, প্রশ্ন হল দিয়াদিদি এসেগেছে কিনা। আমি মা কে জিজ্ঞেস করতে পারছি না এটা, কারণ আমি জানি মা পিসিকে একদম সহ্য করতে পারে না। জেঠু আমায় একটা ক্যাডবেরী দিয়েছে। আমি ওটা নেওয়ার আগেই মা নিয়ে ব্যাগে ভরে দিয়েছে। পরে দেবে। একটা জিনিস ভালো, গাড়িতে আছি বলে আমায় জেঠুকে উঠে প্রণাম করতে হল না।

আমাদের গাড়িটা একদম ফাঁকা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, কী সুন্দর একটা অ্যাডভেঞ্চারাস হাওয়া লাগছে আমার মুখে। কিছুক্ষণ আগেও কটা লরী দেখছিলাম, এখন সেসব নেই। মা টিফিন খেয়ে নিতে বলছে আমায় বারবার। আমার জানলা থেকে মুখ ঢোকাতে ইচ্ছে করছে না।

‘কিছু মনে কোরো না দাদা, আমার মনে হয় এটা বাবার ভিমরতি ছাড়া আর কিচ্ছু না। যে লোকটা সারা জীবন টাকা ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝল না, ছোট নাতিটাকেও অবধি পুজোয় কিছু দিত না, সে হঠাৎ সব সম্পত্তি ভেঙে জঙ্গল করে দিতে বলবে এটা মেনে নেওয়া যায় না।’ মা আমাকে আর একবার ডেকে বিরক্ত হয়ে বলল।

‘পাড়ার লোকেরা তো বলছে বাবা নাকি শেষ দিকে অনেকটা চেঞ্জ হয়ে গেছিল। এলাকায় দুজনের সাথে মামলা চলছিল জমি নিয়ে, সেই সব নাকি তুলে নিয়েছিল। কী হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। বাবাকে এরকম আমি কখনো দেখিনি।’ জেঠু ফ্লাস্কের ঢাকনায় চা-টা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে বলল। আমি ঢুকে বসলাম ভেতরে, বাইরে একটা ইয়াবড় ট্রাক ধুলো ওড়াতে ওড়াতে যাচ্ছে।

‘তোমাদের বাবা পণ নেব না বলেও ছেলের বিয়েতে ঠিক স্কিম করে ছেলের জন্য একটা সোনার হার বাগিয়ে নিয়েছিল। স্যরী এটা আমি বলতে চাই নি, তবে আমার ওনাকে ডবল স্ট্যান্ডার্ড মনে হয় তখন থেকেই। সামনে থাকতে খুব আদর্শের কথা, টিচার ছিল বলে সব সময় জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব। ওদিকে টিচার থাকাকালীনই যে ওনার একটা ধানকল, তিনটে আমবাগান ছিল, টাকা খাটত চারদিকে সেটা কেমন চেপে যেতেন। তোমাদের বাবা যতটা শিক্ষক ছিল, ততটাই ব্যবসায়ীও ছিল।’ মা আর একটা কাপে চা নিয়ে গড়গড় করে বলে গেল।

আমার দাদুকে নিয়ে এইসব নেগেটিভ কথাগুলো শুনতে ভালো লাগছে না। আমি গাড়িটা কোথায় এল বোঝার চেষ্টা করছিলাম। দাদু শিখিয়েছে যেখানে রাস্তার নাম বোঝা যায় না সেখানে দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা ঠিকানা থেকে জেনে নিতে হয়। কিন্তু গাড়িটা খুব জোরে যাচ্ছে, আর আমি অত ফাস্ট বেঙ্গলী পড়তে পারি না বলে আমি ঠিক ম্যানেজ করতে পারছি না।

‘তুমি কী বলতে চাইছ, বাবার এই জঙ্গল তৈরীর মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত আছে?’ বাবা চেঁচিয়ে বলে উঠল। আমার বাবা অল্পেতে চেঁচায়। সব কথাই এমন ভাবে বলে যেন ঝগড়া করছে।

‘সেটা গিয়ে উকিলের সাথে কথা বলে জানতে হবে। সেই ব্যাটারও কোনো স্বার্থ থাকতে পারে। দেখ তার কোনো ভগ্নিপতি হয়তো টিম্বার মার্চেন্ট।’ হেসে বলল জেঠু।

‘ ভগ্নিপতি থেকে মনে পড়ল, তোমাদের বোন কিন্তু খুশিই হয়েছে। সে এমনিই সবসময় চাইত বাবাকে হাইজ্যাক করতে। মনে আছে আমাদের বাড়ি থেকে বাবাকে প্রায় কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছিল নিজের বাড়ি। বাবা আমায় বলেছিলেন ওর বাড়িতে নাকি শোয়ার জায়গা ভালো না।’ মা বকেই চলছে।

‘হুম। যদিও ওর ইচ্ছে ছিল বাবা দিয়ার বিয়ের জন্য কিছু রেখে যাবে।’ বাবা ফোন বের করে টাইম দেখতে দেখতে বলল।

‘কেন? এখন তো বিয়ে করার জন্য টাকা দিচ্ছে সরকার। তাছাড়া দিয়া তো দেখি ফেসবুকে ভালো দেখেই একটা ছেলে পাকড়েছে। আর দেখ না, বাবার চিঠিতে হয়তো কিছু টাকাপয়সার কথা আছে। ছেলে মেয়েকে টপকে হয়তো নাতি নাতনীকে কিছু দিয়ে গেছে।’ মা বলল আবার।

আমি খেতে চাইলাম এবার। বড়দের আলোচনার মধ্যে বেশিক্ষণ থাকলে আমার কেমন সাফোকেশন হয়। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম আর কতক্ষণ লাগবে। বাবা ড্রাইভার কাকুকে আস্ক করে জানালো আরো এক ঘন্টা। আমি একটু বায়না করলাম ব্রেড খাবো না, শুধু ডিমসিদ্ধ খাবো। মা আমায় চোখ বড় বড় করে বকে দিল। আমি বিরক্ত হয়ে ব্রেডটাও নিয়ে নিলাম। একটু খেয়ে গাড়ির জানলা দিয়ে ফেলে দেব। তার আগে এইবার আমি ডিমটা একটু একটু করে খাব, আর বাইরে দোকান দেখব, গাছ দেখব, গ্রামের বাড়ি দেখব, সাইকেলে করে অ্যাত্ত খড় নিয়ে যাওয়া লোক দেখব আর চিঠিটার কথা ভাবব। আচ্ছা দাদুর চিঠিটা হয়ত দেখা গেল যে আর একটা উইল। চিঠির পেছনের পৃষ্ঠায় ইনভিজিবল কালিতে উইল করা আছে। বেশ একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরকে অ্যাপয়েন্ট করা হল। ফেলুদার মত।

এসব ভাবতে ভাবতেই না আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙলে দেখি দাদুবাড়ি এসে গেছে। মা জোরে জোরে ঝাঁকাচ্ছে আমায়। আর ঠিক সামনে দিয়াদিদি হাসি হাসি মুখ করে কিন্তু ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি লাফ দিয়ে নামলাম গাড়ি থেকে। তারপর ছুট লাগালাম বাড়ির দিকে। কাল রাতেও বৃষ্টি হয়েছে তো, তাই সামনের রাস্তাটা বেশ কাদা কাদা।  আমার পা আটকে যাচ্ছিল। আমি তাও এক ছুট্টে একদম ঢুকে গেলাম দাদুর ঘরে। ঢুকে খাটটা দেখে মনে পড়ল দাদু আর নেই। খাটের চাদরটা একদম টানটান। শুধু দাদু দাদু গন্ধটা একদম নেই। তার জায়গায় ঘর জুড়ে রজনীগন্ধার গন্ধ। এই গন্ধটা পেলেই আমার মনখারাপ করে।

দিয়াদিদি আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি ঘুরে হাসলাম। এই পাগলীটা নিশ্চই এতক্ষণ কাঁদছিল। আমি ওর হাতটা ধরে ওর পেটে মাথা দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

 

 

 আমি দাদুবাড়ি এলে কুয়োর পাড়ে স্নান করি ( আমি কুয়োর পাড়া বলি হিহি)। আর বাবা, জেঠু, পিসো সবাই পুকুরে স্নান করতে যায়। আমিও আর একটু বড় হলে পুকুরে যাব। সুইমিং তো এখনি পারি আমি। কিন্তু মা ভয় পায় বলে মহাদেবকাকা কুয়ো থেকে জল তুলে গামলা ভরে দেয়, আর আমি ঝুপ ঝুপ করে জল ঢালি। পাশে কাঁঠাল গাছটা থেকে পাতা এসে পড়ে গামলার জলে, আমি পাতাটা নিয়ে নৌকা নৌকা খেলি। আর স্নানের সময়ে দাদু গামছাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মহাদেবকাকাকে বকাঝকা দেয় ঠিকমত আমার মাথা মুছিয়ে না দিলে, তারপর নিজে মুছিয়ে দেয়।

এইবার মা কিছুতেই কুয়োর পাড়ায় স্নান করতে দিল না আমায়। দাদুবাড়ির বাথরুমে একটা মাকড়সা থাকে। বিরাট বড় একটা কালো মাকড়সা, গায়ে লোম লোম আছে। চৌবাচ্চাটার পাশে থাকে ওটা। বাথরুমে ঢুকে জল ঢালার সময়ে আমার খালি মনে হচ্ছিল মগের মধ্যে ওটা ঢুকে আছে, এক্ষূণি আমার মাথা থেকে বেয়ে বেয়ে নীচে নামবে।

একদম ভালো স্নান হল না আমার। তারমধ্যে খেতে বসেও খাওয়াটা ঠিক জমছে না। দাদুবাড়িতে যেমন রান্না হয়, একদম তেমন হয় নি এবার। জাস্ট কী একটা শাক, ডাল আর বেগুণ ভাজা (ওয়াক্) আর ডিমের অমলেট করে ঝোল। তাও পিসি খুব ভালো বলে আমার অমলেটটা ঝোলে দেয় নি। খেতে বসার আগেই মা আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে যা দেবে চুপচাপ খেতে হবে। আমি তাই একদম থালা থেকে মুখ তুলছিই না।

একটু একটু করে ভাত মাখছি আর খাচ্ছি, আর শুনছি বাকিরা কী করছে। দিয়াদিদির খাওয়া প্রায় শেষ, বড়রা ওঠার আগে টেবিল ছেড়ে উঠতে নেই বলে একটু একটু করে খাচ্ছে। ওদিকে বড়দের খাওয়ার যেন কোনো আগ্রহই নেই। জেঠু শাক দিয়ে মাখতে মাখতেই বলে উঠল,’আচ্ছা বাবার উকিল কিন্তু বিকেলে আসবে। তখন যা যা জিজ্ঞেস করার করে নিতে হবে।’

পিসি মাকে ডালের হাতাটা এগিয়ে দিতে দিতে উত্তরে বলল,’আর কী বলার আছে? বাবা যা উইল করে গেছে তাই হবে। শুনছি নাকি জঙ্গল কীভাবে বানানো হবে সব প্ল্যান অবধি করে দিয়ে গেছে। কোন নার্সারী থেকে গাছ আসবে সব ঠিক করা। বনদফ্তরের সাথে নাকি বাবার কথা হয়ে আছে অলরেডি।’

‘তুমি এতকিছু কোথা থেকে জানলে? বাবা আগে বলেছে তোমায়?’ মা হাতাটা দিয়ে ডালটা ঘোলাতে ঘোলাতে বলল।

‘মহাদেবদা বলল। বাবা ওকে নাকি বলে গেছে জঙ্গলের কেয়ারটেকার করবে।’ একটা গ্রাস মুখে তুলে বলল পিসি।

‘বাট আমাদের ইচ্ছেরও তো একটা দাম আছে, নাকি! বাবা তো এভাবে যা ইচ্ছে করে যেতে পারে না।’ বাবা বেগুণ ভাজার খোলাটা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল।

‘আমি তো সেটাই বুঝছি না, যে বাবার হঠাৎ হয়েছিল টা কী? কেউ নিশ্চই বাবার মাথায় এটা ঢুকিয়েছে। যে নিজের ছেলেদের সম্পত্তি দেওয়ার কোনো দরকার নেই, সব জঙ্গল করে দাও।’ জেঠু আবার বলল।

‘কে মাথায় ঢোকাবে দাদা? বাবা শুনত কারো কথা? মায়ের বেলা দেখলি না? কত বললাম আমার কাছে নিয়ে যাই মাকে, ওর চেনাশোনা এক ভালো ডাক্তার আছে, তাকে দেখাই। কিছুতেই শুনল না।’ পিসি জলের বোতলটা চাইতে চাইলে বলল।

‘মায়ের ট্রিটমেন্ট আমি দেখছিলাম বুড়ি। তোর যদি মনে হয়ে থাকে যে মায়ের চিকিৎসা ঠিকমত হয় নি, তাহলে তখন বলতে পারতি। তখন তো সবাই হাত গুটিয়ে ছিলি।’ বাবা হঠাৎ থালা থেকে হাত তুলে বলে উঠল।

‘আমি সেকথা বলিনি দাদা। তুই বুঝতে পারছিস না’ পিসি হাত তুলে কিছু একটা বলতে গেল, কিন্তু তার আগেই বাবা আবার শুরু করে দিয়েছে,’কী বলতে চাইছিস যথেষ্ট বুঝতে পারছি রে আমি। আর তোর যদি এতই পাওয়ার তাহলে বাবাকে বাঁচাতে পারলি না কেন?’ 

‘বাজে কথা বলিস না দাদা।’ পিসি ঝোলের হাতাটা ফেলে উঠে দাঁড়ালো। ‘যেটা জানিস না সেটা নিয়ে একদম যা ইচ্ছে তাই বলবি না। কদিন দেখতে এসেছিস রে বাবাকে তোরা? বাবার রোগটা ধরা পড়ার কথা শুনেই তোর বউ আগেই কথা শুনিয়ে দিয়েছিল তোর ব্যবসায় এখন চাপ চলছে, তোর ছেলের স্কুলের কত খরচা। তোরা তো শুধু মাঝেমাঝে জমিদারের মত আসতি আর  কাঁসার থালায় খেয়েদেয়ে, ঘুমিয়ে, বাবার হাতে পাঁচশো টাকা গুঁজে চলে যেতি। বাবার অপারেশনের দিন অবধি আসিসনি তুই। টাকা চাইতে পারে বলে শেষদিকে বাবার খোঁজ নেওয়া অবধি কমিয়ে দিয়েছিলি। আমি আর বড়দা করেছি রে সব। এখন সম্পত্তির কিছু পাচ্ছিস না শুনে ঝগড়া করবি বলে দিব্যি ছুটি নিয়ে চলে এসেছিস তোরা। আর বাবা হসপিটাল থেকে ফেরার পর দেখতে চেয়েছিল ছেলেটাকে, তোর বউ ইনফেকশন হয়ে যাবে বলে আসতে দেয় নি।’

পিসি আরো কিছু হয়তো বলত, তার আগেই দিয়াদিদি হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল পিসিকে।

‘বাবা শেষদিকে একদম ওষুধ খেতে চাইতো না। তুই বড়দাকে জিজ্ঞেস কর, শ্রাদ্ধের আগে ঘর গোছাতে গিয়ে দেখি বাবার ঘর থেকে একটা চবণপ্রাশের কৌটোয় কতগুলো ট্যাবলেট লোকানো! রোজ রাতের ওষুধগুলো না খেয়ে লুকিয়ে রাখত বাবা। কারো সাথে দেখা করতে চাইতো না। আমাকে অবধি দেখলে এমন ভাব করত যেন চেনে না। মহাদেবদা ছাড়া কারো হাতে খেত না। ডাক্তারকে বলত তাড়াতাড়ি মরার ওষুধ দিতে। বড্ড অভিমান হয়েছিল রে বাবার। আমাদের সবার ওপর। ছেলে, মেয়ে, বৌ-রা নাতি নাতনী সবার ওপর। নাহলে কেউ বসতভিটে জঙ্গল করে দেবে উইল করে যায় না।’ ফাঁকা এঁটো থালার সামনে বলল পিসি।

‘তোমাদের খাওয়া হয়ে গেছে? ওঠো এবার। যাও গিয়ে শুয়ে থাক ওপরের ঘরে।’ মা কড়া গলায় বলল আমার দিকে তাকিয়ে। আমি মাথা নিচু করে উঠে গেলাম। আমার পাশেপাশে দিয়াদিদিও উঠে এল। গেট খোলার আওয়াজ হল সাথে সাথে। নিশ্চই শাম্বদাদা আর জেঠুমা।

 

 

‘তোর টিকটকগুলো খুব খারাপ হয়। আর তিনটে দেখব, তারপর স্ট্যাটাস মিউট করে রেখে দেব।’ পুকুর পাড়ে বসে বলে উঠল শাম্বদাদা। আমি ঠিকই ধরেছিলাম, ওরাই এসেছে। আর ভাগ্যিস এসেছে! নাহলে আমার তো খালি মনে হচ্ছিল বাবা পাত ছেড়ে উঠে যাবে।

যাই হোক গে, ভেতরে এখন মা আর জেঠুমা খুব গল্প করছে। পিসি কোথায় ঠিক জানিনা। আর বাবা আর জেঠু ছাদে। আমি, শাম্বদাদা আর দিয়াদিদি পুকুরপাড়ে বসে আছি। আমাদের গায়ে অ্যানুয়াল স্পোর্টসের দিনের মত রোদ এসে লাগছে, আমি তো ঘাসে প্রায় শুয়েই পড়েছি। দিয়াদিদি একটা ঘাসের টুকরো নিয়ে আমার মাথায় বোলাচ্ছে।

‘তুই বুঝিস এসব? টিকটকে কত লোক ফেমাস তোর কোনো আইডিয়া আছে?’ শাম্বদাদার দিকে মুখ বেঁকিয়ে বলল দিয়াদিদি।

‘সে লোকে ফেমাস। কিন্তু তুই তো আমি যতদূর জানি মেয়ে থেকে ছেলে হতে পারিস না, একদিকের চুল পার্পল আর একদিকের চুল খয়েরী করলে পিসো তোকে কেলিয়ে আংটা বানিয়ে দেবে। তুই কী করে ফেমাস হবি?’ শাম্বদাদার কথায় আমি হোহো করে হেসে দিলাম।

‘দাদা তুই সবসময় এগুলো বলবি না কিন্তু বলে দিচ্ছি। টিকটকে সবাই এরকম না’ বলতে বলতে ওকে ঘুষি মারতে লাগল দিয়াদিদি।

‘আচ্ছা আচ্ছা কুল কুল’ কোনোরকমে ওকে ঠেকাতে ঠেকাতে বলল শাম্বদাদা। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,’এই, দাদু নাকি আমাদের সবাইকে একটা করে চিঠি দিয়েছে?’

‘শুনলাম তো তাই। বাট চিঠিগুলো নাকি উকিলের কাছে। আজকে সন্ধেয় এসে দিয়ে যাবে।’ দিয়াদিদি বলল।

‘আচ্ছা একটা কথা বল’, শাম্বদাদা পুকুরের দিকে মুখ করে বসল,’এই জায়গাটা সত্যি সত্যি জঙ্গল হয়ে যাবে?’

‘দাদু তো তাই লিখে গেছে। বাট মা বলছিল বাবার কোন পরিচিত ল’ইয়ার বলেছে যে এরকম করা যায় না।’ দিয়াদিদি আমার কানে ঘাসটা দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে বলল।

‘কেন যায় না? তুই যাদব পায়েঙ্গের নাম শুনেছিস? ভদ্রলোক আসামে নিজে নিজে বিরাট একটা অরণ্য তৈরী করেছেন। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে গাছ লাগিয়েছে লোকটা রোজ, গাছেদের দেখভাল করেছে, রোজ সকালে উঠে চলে গেছে নিজের জঙ্গলে। এইভাবে একটা গোটা ফরেস্ট বানিয়ে ফেলেছে লোকটা। ফরেস্ট ম্যান অফ ইন্ডিয়া বলা হয় ওনাকে। ইউটিউবে প্রচুর ডকুমেন্টরী আছে ওনার ওপর, দেখে নিস।’ আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল শাম্বদা।

‘তাহলে আমাদের দাদুকে কী ফরেস্ট ম্যান অফ বিক্রমপুর বলা হবে?’ হেসে বলল দিয়াদিদি।

‘সেটা ডিপেন্ড করছে কাজটা আদৌ হয় নাকি তার ওপর রে।’ জলে একটা মাটির ঢেলা ছুঁড়ে বলল শাম্বদা।

‘কেন? দাদু তো সব ব্যবস্থা করে গেছে। গাছ কোথা থেকে আসবে, সার কোথা থেকে আসবে সব। তারপর কলকাতার কোন একটা নার্সারী থেকে নাকি কর্মচারী হায়ার করে রেখে গেছে, সে আমাদের ফ্যামিলীর পার্মিশন পেলেই কাজ শুরু করে দেবে।’ দিয়াদিদি আঙুলে একটা ঘাস জড়াতে জড়াতে বলল।

‘আর বনদফ্তর কেও নাকি জানিয়েছে।’ আমি অ্যাড করলাম।

‘সবই তো বুঝলাম। কিন্তু প্রাকটিকালী ভাব’ বলে আমাদের দিকে ঘুরে বসল দাদা,’এই পুরো জমিটা জঙ্গল বানাতে গেলে দাদুর বাড়িটা ভাঙতে হবে। ওইদিকে পুরোনো আড়তটা ভাঙতে হবে, কুয়োতলাটা ভাঙতে হবে। কোনো কংক্রিটের স্ট্রাকচার থাকবে না। পাঁচিলটাও না। রাস্তাটা এরকম থাকবে না, মোরামগুলো তুলে ফেলতে হবে। পুকুরটাও আরো বড় করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা একটা জঙ্গল তো এক বছরে বানানো যায় না, গাছ লাগানোর পর তার বেড়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। ততদিন লেবার দেবে কে? কেন দেবে? যে দেবে সে কীসের আশায় দেবে লেবার? তার তো কোনো টাকা পয়সা আসছে না।’

‘দাদু তো লোক ঠিক করে গেছে।’ আমি উঠে বসে বললাম।

‘ধুর পাগলা। সেই লোক যদি কিছু না করে? সে যদি জঙ্গল বানানোর জন্য দাদুর রেখে যাওয়া পুরো টাকাটা মেরে দেয়? ফ্যামিলীর কাউকে সবসময় তার ওপর নজর রাখতে সবে। কে রাখবে? আমার বাবা তো ভেবেছিল বাবা মরলে এই বাড়িটা বেচে একটা মোটা টাকা আসবে, তাহলে আমরা তোদের মত একটা ফ্ল্যাট কিনব। ভাবিস না আমি আমার বাবা মা কে জাজ করছি, বাট আমি বহুবার এটা নিয়ে প্ল্যান করতে শুনেছি ওদের। দাদুর বাড়িটাকে ঘিরে সবার অনেক প্ল্যান ছিল। সেইসব চটকে দিয়ে যদি এই জায়গাটি জঙ্গল হয়ে যায়, তাহলে কেউ দেখতে আসবে?’ শাম্বদা মাটিতে আঙুল দিয়ে দাগ কাটতে কাটতে বলল।

‘হুম। আমার মা তো আবার ভেবেছিল শেষ বয়সে দাদুকে দেখে রাখলে দাদু পুরো সম্পত্তি মেয়েকে দিয়ে যাবে। নাহলে কেন রোজ খেতে দিয়েই দুই দাদার নামে আলাদা আলাদা এপিসোড ধরে ধরে নিন্দে করবে বল? আর জানিস তো, দাদু এসব একদম শুনত না। মা বকবক করে যেত, দাদু ডায়েরীতে কী সব লিখে যেত না তাকিয়ে।’ পুকুরের দিকে তাকিয়ে বলল দিয়াদিদি।

‘জঙ্গল বানানোর প্ল্যান করত বোধহয়। সিরিয়াসলী দিয়া, দাদু সবকিছু থাকতে জঙ্গলই বানানোর প্ল্যান করল কেন বলত? মৃত্যুর পর সম্পত্তি সন্তানদের অনেকেই দিয়ে যায় না। স্কুলটুল করে দিতে পারত। বাট জঙ্গল কেন?’ শাম্বদা আবার বলল।

‘নো আইডিয়া। আর এমন ও না যে দাদু সারাজীবন খুব গাছটাছ লাগিয়েছে। বরং আমি নিজে হাতে দাদুকে পুকুরের ওইপারের পেয়ারা গাছটা কাটতে দেখেছি। খুব কাঠপিঁপড়ে হচ্ছিল বলে।’ দিয়াদিদি ফোনটা বের করতে করতে বলল।

‘এই গাছটা কেমন হেলে গেছে দেখ দিয়াদিদি।’ আমি আঙুল দিয়ে এপারের পেয়ারা গাছটা দেখালাম। পুকুরের দুইপাড়ে দুটো পেয়ারা গাছ ছিল দাদুবাড়িতে। এইপারের গাছটায় ছোট ছোট মিষ্টি পেয়ারা হত, আর ওপারেরটায় বড় বড় কষটে কষটে পেয়ারা। ওই গাছটা দাদু আগেই কেটে দিয়েছে, এইদিকের গাছটাও কেমন ঝুঁকে পড়েছে জলের দিকে। যেন আর একটু নীচু হলেই ঝুপুস করে পড়ে যাবে।

‘মরে নি মনে হয়। ঝড় ফরে হতে পারে।’ গাছটার দিকে একঝলক তাকিয়ে বলল শাম্বদা। তারপর আবার বলতে শুরু করল,’দাদুর চিঠিটা পেলে বড় ভালো হয় রে। দাদু নিশ্চই আমাদের বলে গেছে কেন পুরো বাড়ি ভেঙে জঙ্গল করতে বলে যাচ্ছে।’

এর উত্তরে দিয়াদিদি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই দেখি জেঠুমা ছুটতে ছুটতে আমাদের দিকে আসছে। আমরা দেখেই এগোলাম।

‘শাম্ব তাড়াতাড়ি দৌড়ে বাজার থেকে একটা মালা নিয়ে আয় তো। তোকে কী বলব বল, সবার এত ভুলোমন, কেউ একটা মালা অবধি আনেনি লোকটার ছবিতে দেবে বলে। সবাই বলছে আমি ভেবেছিলাম তুই আনবি। এবার উকিল এসে যদি দেখে ছেলে মেয়েরা বাবার সম্পত্তি নিয়ে বকতে এসেছে অথচ বাবার গলায় একটা মালা অবধি দেয় নি, খুব বাজে দেখাবে।’ জেঠুমা এতটা বলে হাঁফাতে হাঁফাতে শাম্বদার হাতে টাকা গুঁজে দিল।

‘আচ্ছা যাচ্ছি। বাট কোনদিকে পাব? স্টেশনের দিকে আছে ফুলের দোকান?’ শাম্বদা টাকাটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে জিজ্ঞেস করল।

‘আমি যাচ্ছি, আমি চিনি, চল।’ বলে দিয়াদিদি ওর হাত ধরে টানল।

‘আমিও যাব’ আমি বলে উঠলাম অবশ্যই।

তার একটু পরে এখন আমি বারান্দায় একা বসে। আমার হাতে মায়ের ফোন। ফ্রি ফায়ারটা আবার ইনস্টল করব ভাবছি।

 



 

বইতে আর সিনেমায় উকিল যেমন দেখায় এই লোকটা একদম তেমন না। আমি ভেবেছিলাম একটা কালো লম্বা কোট পড়া হুমদো মার্কা লোক হবে, সেখানে দেখলাম একটা চেক শার্ট পড়া সরুমত লোক ভেতরের বড় ঘরটায় বসে আছে। আর তাকে ঘিরে সোফায় আর চেয়ারে বাবা, জেঠু, পিসি, মা, জেঠুমা, পিসো সবাই। শাম্বদা আর দিয়াদিদি বসে দুটো টুলে। পাশে জানলার কোলটায় সাদা চাদর বিছিয়ে তার ওপর দাদুর ছবিটা এনে রাখা হয়েছে, তাতে মালা দেওয়া। সেই রজনীগন্ধার গন্ধটা পেলাম আমি। আমার দমবন্ধ লাগল।

‘এই তো ছোটো নাতি?’ আমায় দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল উকিল লোকটা। মা ইশারা করল আমায় প্রণাম করতে।

আমি নীচু হতেই লোকটা আমায় ধরে ফেলল। আমার থুতনীটা ধরে একটু আদর করে বলল,’আমায় বিকাশকাকা বোলো তুমি হ্যাঁ। গুড বয়।’

আমি গুড বয়ের মত গিয়ে শাম্বদাদার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম।

বিকাশকাকা বলতে শুরু করল,’হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, আসলে ওনার শেষদিকে নিজের সন্তানদের ওপর ভিষন অভিমান হয়েছিল। খালি বলতেন মানুষ রোজ আর একটা মানুষের থেকে দৃরে সরে যায়, এটাই নাকি মহাবিশ্বের নিয়ম। যাই হোক, ওনার সাথে আমার বহুদিনের সম্পর্ক। ওনার এর আগেও অনেক লিগাল কাজকর্ম আমি সামলেছি। একবার তো ওনার এক রাইভ্যাল আড়তদার খুব সমস্যায় ফেলেছিলেন, প্রায় থানা পুলিশ হয়ে কেলেঙ্কারী হয়ে যায় যায়। এই ছোট মেয়ের বিয়ের আগে আগে। আমি অনেক কষ্টে ওনাকে বাঁচাই।’

‘আচ্ছা একটা কথা বলুন’, জেঠু ঘড়িটার ঠিক নীচের চেয়ারটায় বসে প্রশ্ন করল,’বাবার ব্যবসায় কী কিছু ইললিগাল লেনদেন ছিল? আসলে সি ওয়াজ এ ভেরি প্রাইভেট পার্সন। আমাদের কোনোদিনই তেমন কিছু জানতে দেন নি নিজের সম্পর্কে। আর চানও নি আমরা ওনার ব্যবসায় আসি। শিক্ষক ছিলেন, সেখানেও আমাদের তিন ভাই বোনকে কোনোদিন পড়াতে বসাননি। তবে হ্যাঁ, আই মাস্ট সে, হি ওয়াজ এ গুড অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।’

‘হি ওয়াজ এ লায়ন বাই হিজ ওন রুলস।’ হেসে বললেন বিকাশকাকু। তারপর আমাদের দিকে একটু তাকিয়ে নিয়ে বললেন,’দেখুন ব্যবসায় সব কিছু যে সাদা পথে হয় না সেটা নিশ্চই আপনাদের বোঝাতে হবে না। ওনারও যেত না। তবে যা করেছেন পরিবারের ভালোর জন্যই করেছেন। আমায় খুব বলতেন ছোট ছেলের বিজনেসটা দাঁড়িয়ে গেলে খুব শান্তি পাবেন।’

‘আচ্ছা এই বাড়ি ভেঙে জঙ্গল বানানোটাও কী পরিবারের ভালোর জন্য নাকি?’ দরজার একদম সামনে থেকে বলে উঠল পিসো।

‘আমার সেটা প্রশ্ন করা এত্তিয়ারে পড়ে না। তবুও এরকম একটা উইল করবেন শুনে আমি প্রশ্নটা না করে থাকতে পারিনি।’ পায়ের পা তুলে বলতে শুরু করল বিকাশকাকু,’আসলে শেষদিকে ওনার মধ্যে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছিল। ওনার স্ত্রীর মৃত্যু, ছেলে মেয়েরা নিজেদের নিজেদের লাইফে সেটলড হয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে ওনার মনে হচ্ছিল ওনার আর প্রয়োজন নেই। সবকিছু থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। আমাকে খুব বলতেন, পাশাপাশি থাকা দুটো মানুষ পরস্পরের থেকে দূরে সরে যেতে পারে, কিন্তু দুটো গাছ কখনো যেতে পারে না। ওনার মনে হয়েছিল মানুষ যত সিভিলাইজড হচ্ছে তত তার অন্যের প্রয়োজন কমছে, আর লোভ বাড়ছে। আমায় বারবার বলতেন, আমি মরে গেলে ওরা সবাই এখানে একসাথে আসবে। তার আগে এলে আমার জন্য খাটতে হবে। আর নিজে নিজের জীবনেও যা যা অনায্য কাজ করেছেন, খুব বলতেন সেগুলোর কথা। ওনার মনে হয়েছিল এই সবের একমাত্র কারণ রুট থেকে দূরে সরে যাওয়া, প্রকৃতি থেকে সরে আসা। বলতেন, মানুষ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলেই মেশিন হয়ে যায়। আই গেস এই সব চিন্তাভাবনা থেকেই উনি একটা জঙ্গল তৈরী করতে চেয়েছেন। উইলের সব কাজকর্ম কমপ্লিট হওয়ার পর আমায় বললেন, পৃথিবীটা তো আমার না। হোটেলের ঘরের মত। আমি নিজে কদিন ইউজ করলাম। এবার রুম ছাড়ার আগে সব আগের অবস্থায় রেখে যাচ্ছি।’

এতটা বলে জল খেতে থামল বিকাশকাকু।

‘সে তো নাহয় বুঝলাম, কিন্তু এটা তো প্রাকটিকাল কথা নয় বলুন? একটা জঙ্গল তো চাইলেই বানানো যায় না? আর সেটা বানানো হলে যদি সেটার সুযোগে কোনো অসামাজিক কাজ হয়, তখন?’ পিসি পিসোর পাশ থেকে বলে উঠল।

‘ওনার প্ল্যান অনুযায়ী গার্ড থাকবে তিনজন জঙ্গলের। এখানে তো কুড়ি বিঘা জায়গা আছেই। আশেপাশের আরো দশ বিঘামত জায়গা উনি কিনে রেখেছেন। এই পুরোটা নিয়েই জঙ্গলটা বানানো হবে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের হাতে চলে যাবে তো পুরোটা, তখন আইন শৃঙ্খলা ওদের দায়িত্বে।’ বিকাশকাকু আবার বলল।

মা এরপর বাবাকে কী একটা কানে কানে বলল, আর বাবা একটু গলা খাঁকরে বলে উঠল,’আচ্ছা বিকাশবাবু, বাবা নাকি নাতি নাতনিদের একটা করে চিঠি লিখে গেছে? আপনিই বললেন। সেটা ওদের দিয়ে দিন না। ওরা তারপর চলে যাক, বড়দের মধ্যে বসার দরকার নেই। আপনি তারপর উইলটা পড়ে শোনাবেন নাহয়।’

‘হ্যাঁ। এই যে খামে আছে। দাঁড়ান।’ বলে ব্যাগ থেকে তিনটে খাম বের করে নাম দেখে দেখে আমাদের তিনজনের তিনটে বাদামী রঙের খাম ধরিয়ে দিল বিকাশকাকু।

আমরা খাম খুলে দেখলাম ভেতরে সাদা কাগজ।

‘আমি ঠিকই ধরেছিলাম বাবার একটু মাথার গোলমাল হয়েছিল। আচ্ছা উকিলবাবু, মানসিক ভারসাম্যহীন কোনো মানুষের উইল কী আদালতে গ্রাহ্য হবে?’ জেঠু উঠে এসে আমার হাত থেকে চাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল।

‘সেটা না। মানে ওনার তো কোনো মেন্টাল ডিফর্মিটির কেস নেই, প্রেসক্রিপশন ও নেই। স্রেফ এই চিঠির ভিত্তিতে এতটা প্রমাণ করা যাবে বলে মনে হয় না।’ বিকাশকাকু মাথা নাড়ল।

আমি দেখলাম আমার মত শাম্বদাদা আর দিয়াদিদিও চুপ হয়ে বসে আছে। আমার অবশ্য মনে হচ্ছে একবার মোম জ্বালিয়ে তার সামনে চিঠিটা নিয়ে গিয়ে দেখলে বেটার হয়। দেখি, শাম্বদাদাকে বলব।

‘দেখুন বিকাশবাবু, আমরা প্রত্যেকে প্রাপ্তবয়ষ্ক, উই আর অল এস্টাব্লিশড ইন আওয়ার লাইফ। আমাদের যদি মনে হয় আমাদের বাবা কোনো ভুল ডিসিশন নিয়েছেন, আমাদের উচিত সেটার প্রোটেস্ট করা। তাই না?’ জেঠু আবার বলে উঠল। আমি দেখলাম বাবাও চশমা ঠিক করে মাথা নাড়ল।

‘আপনারা ঠিক কী করতে চান দেন?’ বিকাশকাকু আবার জিজ্ঞেস করল।

‘সেটা আপনার সাথে বসে ডিসাইড করব বলেই তো সবাই এখানে এসেছি।’ বাবা চেয়ারটা টেনে সামনে এসে বসল। ‘আই নো বাবা মাস্ট হ্যাভ থট অফ এ নোবেল কজ। আমার বাচ্চা ছেলেটাও জানে যে এখন গাছ লাগানো ইটিসি খুব দরকারী। আমরাও আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে একটা বাগান করেছি সবাই মিলে। বাট সেটার জন্য অ্যানসেস্ট্রাল প্রপার্টি মায়ের ভোগে পাঠিয়ে দেওয়াটা কোনো কাজের কথা নয়। তাই না? হ্যাঁ, এই জায়গাটায় একটা ইকো টুরিজম করা যেত যদি, তাহলে ভাবতাম। পুরুলিয়া কী শান্তিনিকেতন হত, তাহলে ভেবে দেখা যেত।’ বাবা হেসে উঠল।

‘হ্যাঁ। তাই বলছি আপনি এই উইশের প্ল্যানটা ড্রপ করুন। কীভাবে করা যায় বলুন। আপনি এত এমিনেন্ট ল’ইয়ার। আপনি চাইলেই করতে পারবেন। লেটস ডিসকাস ইট। ওকে?’ জেঠু বাবার কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল।

‘আর একটা ছোটো অনুরোধ আছে আপনার কাছে’ এবার পিসি মুচকি হেসে বলল।

ব্যাগের চেনটা বন্ধ করে বিকাশকাকু গম্ভির গলায় বলল,’বলুন।’

‘আমরা ভাই বোনেরা বহুদিন পর একসাথে হয়েছি আজকে। আপনি বাবার এত দিনের পরিচিত মানুষ। তাছাড়া আমাদের আপনি এত সাহায্য করছেন। আমাদের অনুরোধ আপনি আজকে রাতের ডিনারটা আমাদের সাথে করুন।’ পিসি বলে উঠল।

‘হ্যাঁ। এটা আমাদের সবার রিকোয়েস্ট। আপনি প্লিজ না করবেন না।’ পিসির সাথে সাথেই মা বলে উঠল। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,’যাও তোমরা ওপরে গিয়ে টিভি দেখ তো এবার। রাতে খেতে আসার আগে আমাদের ডিস্টার্ব করবে না একদম। আর দিয়া, ভাইকে একটু দেখে রাখিস তো মা।’

আমরা অগত্যা বেরিয়ে এলাম। আমার কেমন মনে হচ্ছিল খুব খারাপ কিছু একটা হতে চলেছে। অন্ধকার  সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শাম্বদা বলে উঠল,’এইবার মাল খাবে দেখিস বালটা। তারপর সব উইল ফুইল বদলে যাবে।’

‘তুই খিস্তি দিলি দাদা?’ দিয়াদিদি আমার হাত ধরে নিয়ে উঠতে উঠতে বলল।

‘দিলাম। একটু পরে তোর বাবাও দেবে, আমার বাবাও দেবে। শুধু তাই না, হয়তো নিজের বাবাকেও বলবে এই বুড়োর বালছাল উইলের জন্য আমার নতুন ফ্ল্যাট কেনার আইডিয়াটা গাধার গাঁড়ে চলে গেল বুঝলেন উকিলবাবু। এই নিন, আর এক পেগ খান, এই যে, আমার বাবার ছবির সামনে বসে বসে তন্দুরী চিকেন দিয়ে খান। আর বুড়োর উইলটার পেছন মেরে দিন।’ অন্ধকার সিঁড়ির কোণাটায় দাঁড়িয়ে বলল শাম্বদা।

ইস। আমার কান ভোঁ ভোঁ করছে। আমি দিয়াদিদির হাত ছাড়িয়ে তাড়াতাড়ি বারান্দায় উঠে এলাম। পুরো বারান্দাটা একটা অন্ধকারের টানেল মনে হচ্ছে। আমার একটু একটু ভয় করছে এইবার। খুব মনে হচ্ছে দাদু ছাদ থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে বারান্দাটা দিয়ে এগিয়ে এসে আমার পাশ থেকে নীচে নেমে যাচ্ছে। আমি চুপ করে অন্ধকারে মিশে দাঁড়িয়ে রয়েছি যাতে দাদু আমায় চিনতে না পারে।

‘ঈশপের একটা গল্প আছে জানিস। দাদুই বলেছিল আমায়। বৃদ্ধ সিংহের গল্প।’ আমরা বারান্দায় আলো জ্বালিয়ে তিনটে চেয়ার নিয়ে এসে বসার পর শাম্বদা বলতে শুরু করল।

‘কী গল্প বল দাদা’ ওর দিকে ঘুরে বলল দিয়াদিদি। আমিও চেয়ারের বেতটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছিঁড়তে ছিঁড়তে শুনতে লাগলাম গল্পটা।

‘গল্পটা হচ্ছে এরকম’, একটু গলা খুকখুক করে নিয়ে বলতে শুরু করল শাম্বদা,’বনের সবচেয়ে শক্তিশালী সিংহ একদিন বৃদ্ধ হল। খুব বুড়ো হয়ে গেল একেবারে। সে আর উঠতে পারে না, দৌড়তে পারে না, শিকার ধরতে পারে না। সে একটা বড় পাথরের পাশে পড়ে রইল। সেইটা প্রথমে দেখতে পেল একটা ষাঁড়। সে তো হঠাৎ সিংহকে দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে গেছিল। কিন্তু তারপর সিংহটা তার দিকে তেড়ে আসছে না দেখে আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে গেল। গিয়ে বুঝল সিংহটা আর উঠতে পারবে না। তখন সে পা পেঁচিয়ে এক লাথি মারল সিংহটাকে। বহুদিন আগে সিংহটা ওকে একবার তাড়া করে প্রায় ধরে ফেলছিল।’

‘আচ্ছা তারপর তারপর?’ আমি আগডুম বাগডুম হয়ে বসলাম।

‘তারপর ষাঁড়টাকে দেখে একটা শেয়াল এগিয়ে এল। সে ও সিংহের এই অবস্থা দেখে ফ্যাকফ্যাক করে হেসে মারল সিংহের পেছনে এক লাথি। অথচ এই সিংহটাই একদিন ওকে কিছুটা খাবার দিয়ে সাহায্য করেছিল।’ শাম্বদা পা দিয়ে বারান্দার গ্রীলটা খোঁচাতে খোঁচাতে বলল।

‘সিংহটা কিছু বলল না?’ দিয়াদিদি জিজ্ঞেস করল।

‘নাহ। তার তো আর জোর নেই কোনো। সে অসহায় ভাবে মার খেতে লাগল। তারপর শেয়ালটার দেখাদেখি একটা নেকড়ে এল। সে এসে সিংহটার একটা কান কামড়ে দিল। সবাই হো হো করে হেসে উঠল। আর সিংহটার কান দিয়ে গলগল রক্ত পড়তে লাগল। সেই দেখে একটা গাধা এগিয়ে এল। সে অবধি সিংহের একদম সামনে গিয়ে মুখ ভেংচিয়ে মারল দু পা তুলে সিংহের বুকে এক লাথি। সিংহটা ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল। সেই শুনে সবাই আরো জোরে হেসে উঠল।’ এতটা বলে চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো শাম্বদাদা। তারপর আবার কেমন রহস্যময় গলায় বলতে শুরু করল,’তখন জঙ্গলে রাত্রি জানিস। জঙ্গলে সব নাটক রাত্রিবেলা হয়। সকালে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না রাতে কী কী হতে পারে। সিংহটাকে যে ইচ্ছে মারতে পারছে এই কথা বাতাসের বেগে জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ল। দলে দলে সব পশুরা ছুটে এল ব্যাপারটা কী হচ্ছে দেখতে। আর সিংহটার মনে হচ্ছিল সে একবার তো বৃদ্ধ হয়ে, অশক্ত হয়ে মরেছিলই, তারচেয়েও যেন বড় মৃত্যু হল এই অপমানটা। যে পারছে এসে যেমন খুশি মেরে যাওয়ার অপমানটা।’

‘তারপর কী হল রে দাদা?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘তারপরে কী হল দাদু বলে যায় নি আমায়। কিন্তু আমি এইমাত্র জানতে পারলাম গল্পটার এর পর কী হল। গল্পটার পরের পার্টটাই দাদুর চিঠিতে লেখা আছে রে।’ আবার রহস্যময় গলায় বলল শাম্বদা।

‘মানে?’ বলে উঠল দিয়াদিদি।

‘মানে চিঠিতে আসলে কিচ্ছু নেই তো? কারণ দাদু জানত চিঠিটা না দিলে আমাদের বাবামা আমাদের এখানে নিয়েই আসবে না। আর নিয়ে না এলে আমরা গল্পের বাকিটা জানতে পারব না।’ শাম্বদা বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে বলল।

‘বাকিটা কী বল না দাদা’ আমি আবার বলে উঠলাম।

‘চল নীচে চল, পুকুর ধারে চল। ওখানে বলছি। চাপ নেই, কেউ জানবে না, সবাই উকিলের সাথে মদ খেতে ব্যস্ত।’ বলে নীচে নেমে গেল শাম্বদা। আমরা ওর সাথে সাথে নেমে এলাম।

‘ধর, এই পুরো বাড়িটা আসলে জঙ্গল হয়ে গেছে। এই পুরো জায়গাটা জঙ্গল, বড় বড় গাছে ঘেরা। গাছের মাথা পেরিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে না এতটাই ঘন জঙ্গল।’ পুকুরের সামনেটায় এসে হাত ছড়িয়ে বলল শাম্বদা।

আমরা দুজনে চুপ করে রইলাম। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে আমার। ঝিঁঝির ডাক শুনলেই আমার কেমন জঙ্গলে আছি জঙ্গলে আছি মনে হয়। তারমধ্যে শাম্বদাদার কথা শুনে আমি যেন দেখতে পাচ্ছি সত্যিই আমরা একটা জঙ্গলের মধ্যে রাত্রে দাঁড়িয়ে, দুপাশ দিয়ে বিরাট বড় বড় গাছ উঠে গেছে, তাদের ঝুরি নেমে এসেছে, লতানো গাছগুলো সাপের মত উঠে গেছে বেয়ে বেয়ে। কেমন একটা গন্ধ আসছে নাকে, সবুজ সবুজ গন্ধ।

‘ওই দিকটায় সিংহটা পড়ে আছে দেখ।’ শাম্বদা বাড়ির দিকে হাত দেখাল। আমরা সবাই ঘুরে তাকালাম। তারপর আবার বলতে শুরু করল,’সব জন্তুরা গোল হয়ে বসে আছে জানিস তো, সিংহটাকে সবাই মারবে। এক এক করে লাথি মারছে। নেকড়ে, শেয়াল, ষাঁড়, গাধা, পেয়ারা শজারু, হরিণ সব্বাই। সিংহটা কাঁপছে, ওর চোখ দিয়ে জল পড়ছে, ও বারবার মরে যাচ্ছে। কিন্তু কিচ্ছু করতে পারছে না।’

‘আমরা কারা দাদা?’ জিজ্ঞেস করল দিয়াদিদি।

‘আমরা পাখি। আমরা ওপর থেকে দেখছি পুরোটা। ওরা যতটা দেখতে পাচ্ছে আমরা তার থেকে বেশি দেখতে পাচ্ছি। আমরা মারব না সিংহটাকে। হ্যাঁ?’ শাম্বদা পুকুরধারের ওই পেয়ারা গাছটার দিকে মুখ করে বলে চলল।

‘আমরা তাহলে কী করব?’ আবার জিজ্ঞেস করল দিয়াদিদি।

‘জঙ্গলটা তৈরী করতে হবে রে দিয়া। আমাদের দাদু লোকটা ভালো ছিল না, কিন্তু একটা জঙ্গল তৈরীর স্বপ্ন দিয়ে গেছে আমাদের। আর একটা সাদা পাতা। আমরা পাখি তো, আমরা জঙ্গল তৈরী করতে পারি। আমরা বীজ ছড়াতে পারি বল?’ একদৃষ্টে নুইয়ে পড়া গাছটার দিকে তাকিয়ে বলে গেল শাম্বদাদা।

তারপর আমি ছুট্টে গিয়ে পেয়ারা গাছটাকে ঠেলে ধরলাম। গাছটাকে সোজা করে দাঁড় করাতে হবে। নাহলে আবার ঝড় এলে  এই গাছটাও ডুবে যাবে। আমার সাথে দিয়াদিদি হাত লাগালো। শাম্বদাদা হাত লাগালো।

দাদু হাত লাগালো।


___________________________________________________________________________

 

 

 

মন্তব্যসমূহ