প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান
তমোঘ্ন নস্কর
ষট্চত্বারিং পর্ব: আরব
হন্তারক
জুন
মাসের মধ্যবর্তী পর্যায়ে এলে ভীষণভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। মনে পড়ে, আজ থেকে
প্রায় ১৪০০ বছর পূর্বে সিন্ধু প্রদেশের অধিগ্রহণের মধ্যে দিয়ে স্থায়ীভাবে
বিদেশি শক্তির পদানত হওয়ার সূত্রপাত হয়েছিল ভারতবাসীদের।
৭১২
খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন, সিন্ধু দেশের আরুরের প্রান্তরে রাজা দাহির এবং জাঠেদের
সম্মিলিত বাহিনী ভীমবিক্রমে পারস্য সৈন্যবাহিনী এবং আরবের খলিফার সম্মিলিত বাহিনীর
সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। যুদ্ধের ফলাফল আগে থেকেই খানিকটা নির্দিষ্ট ছিল,
তার কারণ এর আগে উপর্যুপরি আরব-পারস্য সম্মিলিত আক্রমণ অনেকখানি দুর্বল করে
দিয়েছিল রাজা দাহিরের সুসজ্জিত সৈন্য বলকে।
তবু
প্রাণপণে সংগ্রাম করেছিলেন তাঁরা। যুদ্ধের এক পর্যায়ে আর না পেরে, আরব সেনাপতি
বিন কাসিমের নির্দেশে রাজা দাহিরের রণহস্তিকে লক্ষ্য করে ভীষণ অগ্নিময় গোলা ছোড়া
হয়। আগুনের ভয়ে সেই হস্তি উন্মত্তের ন্যায় আচরণ করে এবং রাজা দাহিরকে ফেলে
রণক্ষেত্র থেকে পলায়নপর হয়। এমতাবস্থায়ও রাজা দাহির হাল ছাড়েননি। মাটিতে পড়েও
বীরের মতো লড়াই করে চলেছিলেন। সেই সময় আততায়ী পিছন থেকে শরনিক্ষেপণ করে তাঁকে
হত্যা করে।
সিন্ধু
প্রদেশে হিন্দু তথা ব্রাহ্মণ রাজবংশের পতন ঘটে। রাজা বাহিরের দুই স্ত্রী ও দুই
কন্যা ভীষণ সংগ্রাম করেছিলেন, এবং প্রায় চারটে দিন রেওয়ারির দুর্গ শক্ত করে ধরে
রেখেছিলেন। চতুর্থ দিনে রেওয়ারি দুর্গ পতন হলে রানিরা জহরব্রত পালন করেন। কিন্তু
তাঁর দুই মেয়েকে (সূর্যদেবী ও পরিমল দেবী) জীবিত অবস্থায় বন্দি করা হয় এবং
তাঁদেরকে সরাসরি খলিফার দরবারে খলিফার কাছে উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হয়।
সূর্যদেবী
এবং পরিমল দেবীর সেই প্রতিশোধ গ্রহণের কাহিনি আমরা সবাই জানি। সে নিয়ে ছবিও
হয়েছে। তাঁরা খলিফাকে বলেছিলেন আমাদের স্পর্শ করতে পারবেন না, তার কারণ আমাদেরকে
বিবাহ করেছেন বিন কাশেম। আমরা বিন কাশেমের স্ত্রী। বিন কাশেম তখন যুদ্ধ-শেষে
প্রচুর ধনসম্পত্তি নিয়ে আরবে ফিরে আসছিলেন। পথের মধ্যেই সুলতানের শাস্তির বার্তা
পান, অন্য সেনাপতিদের দ্বারা চামড়ার মধ্যে বেঁধে লোহার সিন্ধুকের ভিতরে করে তাঁকে
আরবে আনা হয়। যখন কাশেম সুলতানের সামনে আনীত হন, ততক্ষণে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ
করেছেন। দুই বোন পরস্পরকে হত্যা করার পূর্বে জানিয়ে যান, কাশেমের বিষয়ে তাঁদের
অভিযোগ মিথ্যা। এভাবেই পিছন থেকে পিতৃহন্তার প্রতিশোধ নিলেন।
এর
ফল হল সাংঘাতিক। ভীষণ আক্রোশে সুলতানের আরব সৈন্যবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল ভারতবর্ষের
বুকে। একে একে তারা পদানত করল সমস্ত সিন্ধু প্রদেশ, কচ্ছেলা, মৌর্য, সৌরাষ্ট্র,
গুর্জর, চপোটাক প্রভৃতি। একের-পর-এক রাজ্যকে পদানত করতে করতে দক্ষিণ গুজরাট তথা
লতা অঞ্চলের নভসারিকা বা নভসারিতে এসে উপস্থিত হলেন। এই অঞ্চল অতিক্রম করলে
একেবারে করনাটবালার দ্বারপ্রান্ত অর্থাৎ দাক্ষিণাত্য প্রবেশের মুখ ।
চালুক্য
সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি তখন দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য। আরব সৈন্যদল বাহিত হয়ে
আসছিল সেই সুদূর আরব এবং পারস্য হতে, ফলত কর্নাটক অবধি আসতে আসতে তাদের স্থল
বাহিনী অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাই তাদের সরাসরি নৌবাহিনীর সাহায্য নিতে
হল। কারণ শ্রীলঙ্কা-আরব বাণিজ্যপথের একটি ধারা সে-সময় ছিল।
রাজা
বিক্রমাদিত্যের তিন সুযোগ্য সেনাপতি তিনটি বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন— অভনিজানাশ্রী
পুলকেশি (মধ্যম পুত্র), দান্তিদুর্গ (পরবর্তীতে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন), জয়শ্রী মঙ্গলরাস। এবং আরব সৈন্যবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে
জুনায়েদ ইবন আব্দুল আল-রহমান আল-মূরি, তামিম ইবন জাইদ আল-উতবি, আল-হাকিম ইবন
কাওয়া না আল-কালবি।
৭৩৭-৭৩৮
খ্রিস্টাব্দ
এই
সমস্ত সময়কাল জুড়ে লাগাতার আক্রমণ করে চলছিল আরব বাহিনী। বারবার সেই আক্রমণ
প্রতিহত করছিল দক্ষিণ গুজরাট তথা বাতাপির চালুক্য বংশের বিভিন্ন শাসকরা।
কিন্তু
ক্রমাগত বোঝা যাচ্ছিল যে, কঠিনভাবে তাদেরকে পরাস্ত না করলে এই ঢেউ আটকানো অসম্ভব।
সেইমতো স্থলবাহিনী আর নৌবাহিনীর সম্মিলিত প্রয়াস করা হয়।
প্রায়
দশ হাজার সৈন্যের সুশিক্ষিত-সুদক্ষ আরবি বাহিনী মুখোমুখি হয় চালুক্য বংশের
নেতৃত্বাধীন তিন রণনায়কের।
আরব
নৌকার সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য ছিল তারা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার উপযুক্ত এবং ভারী ভার
বহনকারী নৌপোত। তুলনায় কঙ্কন উপকূলের আশপাশের যে-সমস্ত রণনৌকাগুলি ঘুরেফিরে
বেড়াত (মূলত জলদস্যুদের থেকে বণিকদের সুরক্ষিত রাখার জন্য) তারা অনেক হালকা এবং
দ্রুত আক্রমণ করে পালিয়ে আসতে সক্ষম। ভারতবর্ষের গভীরে প্রবেশ করলে ভারী
নৌপোতগুলিকে উপর্যুপরি আক্রমণে বিচ্ছিন্ন করে দিত এই ছোটো ছোটো নৌবহরগুলি। আগেই
বলেছি, আরব সৈন্যদের একটি বাহিনী স্থলপথে অগ্রসর হচ্ছিল। অপর একটি বাহিনী ও রসদ
বড়ো বড়ো নৌপরিবহন দ্বারা বাহিত হয়ে আসছিল। তাদের পরস্পরের মধ্যে সংযোগ
বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই সিন্ধু প্রদেশ থেকে বয়ে আনা সৈন্য এবং রসদের ভাণ্ডারে খুব
দ্রুত টান পড়বে। এভাবেই আক্রমণ করে চলেছিলেন চালুক্য বংশের সেনাপতিরা।
বিচ্ছিন্ন
আরব সৈন্যরা বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ ভূমি এবং ছোটো ছোটো বন্দরে নামতে বাধ্য হলেন।
বন্দরগুলি দখল করা তাদের পক্ষে কঠিন ছিল না, কারণ তাদের ভারী উৎক্ষেপণ যন্ত্র অতি
সহজেই এই ছোটো ছোটো বন্দরগুলি দখল করে নিত। কিন্তু মুশকিল হল ওই অজস্র ছোটো ছোটো
বন্দর দখল করতে গিয়ে রসদে টান পড়ল। এদিকে অন্য কোনও দ্বিতীয় উপায় নেই, একত্রিত
হওয়ার জন্য তাদেরকে স্থলপথের আশ্রয় নিতে হবে।
আর
জঙ্গলাকীর্ণ সেই স্থলপথে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল চালুক্য স্থলবাহিনী। এ অঞ্চল
তাদের চেনা, এ অঞ্চলের প্রতিটি গিরি-কন্দর-গুহা-নদী-খাঁড়ি সবই তাদের চেনা। ফলত
ঝটিকা আক্রমণ করতে তাদের কোনও সমস্যা হয়নি। এইভাবেই তারা ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল
আরবি বাহিনীকে। বিপুল সংখ্যক আরবি সৈন্য পরাস্ত এবং নিহত হয়।
অতি
কষ্টে হাজার দশেক আরবি সৈন্য এবং তাদের তিন সেনাপতি, পতাকাতলে একত্রিত হয়ে নভসারি
অব্দি পৌঁছোয়। সেই ভীষণ সংগ্রামে চালুক্য বংশের সৈন্যরা তাদেরকে ভীষণভাবে পরাস্ত
করে। পিছু হটতেও ব্যর্থ হয় তারা, কারণ যে-পথে এসেছে সেই পথেই তাদের ফিরতে হবে।
সে-সমস্ত পথই জয়ী চালুক্য রাজাদের সাম্রাজ্য। একপ্রকার নিশ্চিহ্ন হয় সুবিশাল
আরবি বাহিনী।
এই
যুদ্ধের ফলাফল ছিল ব্যাপক। দীর্ঘ সময় দক্ষিণাংশ আরবি-পদানত হয়নি। বোঝা গিয়েছিল,
ওই সুদূর আরব দেশ থেকে এসে এই অঞ্চলগুলিকে পরাস্ত করা যাবে না। এই অঞ্চলকে পরাস্ত
করতে হলে ভারতবর্ষেই নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে হবে।
অভনিজানাশ্রী
পুলকেশি ইতিহাসে চালুক্য বংশের শ্রেষ্ঠ বীর হিসাবে এবং দক্ষিণের রক্ষক হিসাবে
স্থায়ী হয়ে গেলেন। তিনি উপাধি পেলেন চালুক্যকুলথিকারা, অর্থাৎ চালুক্য
সম্রাজ্যের গহনা। মানুষ তাঁকে ভালোবেসে উপাধি দিল দক্ষিণাপথসাধারা, অর্থাৎ
দক্ষিণের স্তম্ভ পৃথিবী বল্লভ বা পৃথিবীর রাজা।
আমাদের
বইয়ে তাঁকে নিয়ে বড়ো কম লেখা আছে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজাদের ইতিহাসে প্রাচীন
গৌরবের কথা অর্থাৎ চোল, চালুক্য, রাষ্ট্রকূট কম আলোচিত। আশা করব আমাদের
সুবর্ণভূমির প্রাচীন ইতিহাস আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।
সূত্র:
(১)
Political
History of the Chālukyas
of Badami, Durga Prasad Dikshit.
(২)
‘Inscriptions
of the Kalachuri-Chedi Era’, in Corpus
Inscriptionum Indicarum Vol. IV
Part I.
(৩)
নভসারি তাম্রপত্র
___________________________________________________________________________
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:
প্রথম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html
দ্বিতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html
তৃতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html
চতুর্থ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
পঞ্চম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
ষষ্ঠ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html
সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html
অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html
নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html
দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html
ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html
চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html
পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html
ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html
সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html
অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html
ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html
বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html
একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html
দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html
ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html
চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html
পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html
ষট্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html
সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html
অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html
ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html
ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html
একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html
