প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর

 

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান

 

তমোঘ্ন নস্কর

 

 

অষ্টচত্বারিংশ পর্ব: বীরত্বের বসন্তোৎসব— এক অনন্য ইতিহাস

 

তরবারি বের করে উঠে দাঁড়ালেন রাও— এত বড়ো সাহস ওই আফগান সরদারের! তাঁর মা-বোনেদের অপহরণ করে নিয়ে যাবে? তিনি বেঁচে থাকতে মা-বোনেদের অপমান কেউ করতে পারে না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছেরাজপুরোহিত রাওকে স্মরণ করালেন, “রাজপুতরা যুদ্ধনীতিতে বিশ্বাস করে। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর তারা যুদ্ধ করে না। স্বয়ং রাও পৃথ্বীরাজ চৌহান কেবল এই কারণেই পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু তবুও নিজের নিয়ম বদলাননি।”

রাও বললেন, “মা, বোনের সম্মানের চাইতে বড়ো আর কিছু নেই।”

রাজপুরোহিত বললেন, “কিন্তু রাও এই ধর্ম লঙ্ঘনের ফলে যে আপনার মৃত্যুও হতে পারে...

রাও শুনতে চাইলেন না। নারীকে অপহরণ মানে সরাসরি সম্মানের মূলে আঘাত করা, মা-কে অপমান করারাও হয়ে তিনি যদি তার রাজ্যের নারীদের উদ্ধার করতে না পারেন, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এক দস্যুর অঙ্কশায়িনী হতে বাধ্য করেন— তা হলে সেই লজ্জা তাঁকে শুধু নয়, তাঁর আগামী প্রজন্মকেও অভিশপ্ত ও লজ্জিত করে রাখবে। শত শত নারীর অভিশাপে তাঁদের মারোয়ার রাজত্বও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

তাই সবার অলক্ষে নিজের ঘোড়াশালে গিয়ে প্রিয়তম ঘোড়ার সঙ্গে সমঝোতা করে নিলেন রাও। আজ হয়তো আমরা দু’জনে ফিরে আসতে নাও পারি। অবলা প্রাণীটা প্রভুর হুকুমে নিশ্বাস ফেলে সায় দিল। যুবক রাও-কে পিঠে নিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে চলল খুরের শব্দ তুলে... খট খট খট খট খট খট...

সিংহভাগ সৈন্য স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইল, নিয়ম ভাঙ্গা কী উচিত হবে— দেবতার রুষ্ট হবেন না তো? কিন্তু রাজার প্রিয়তম পার্ষদ, সহচর, দেহরক্ষীরা আর স্থির থাকতে পারল না। আর্তের ডাকে সাড়া দেওয়া বীরের সবচাইতে বড়ো কর্তব্য। নারীর বিপদে যদি তারা এগিয়ে না যায় ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। আর দেবী মা তো ওঁর মুখ ফিরিয়ে নেবেন। থাকুক পড়ে নিয়ম, থাকুক পড়ে পুরোহিতের নির্দেশ, তারা তাদের রাও-এর সঙ্গেই যাবেন।

ত্রিশ জন সৈন্যের একটি ছোট্ট রাজপুত বাহিনী পিছু নিল রাওয়ের। আর পিছনে দাঁড়িয়ে রইল মস্ত মারোয়াড় সাম্রাজ্য।

 

***

আফগান সরদার গাদুলা খান সন্ধ্যার কাজকর্ম শেষ করে একটু আয়েশ করে বসে ছিলেন। আজকে সন্ধ্যাবেলায় বেশ কয়েকজন রাজপুত নারীকে অপহরণ করেছেন তিনি। মরুদেশে মরুদ্যান জলের একমাত্র ভরসা। অনেকদিন ধরে শুনেছিলেন মেরতা গ্রামের মেয়েগুলো জল আনতে তাদের নগরের বাইরে আসে। তক্কে তক্কে ছিলেন। হামলা করে সব্বাইকে তুলে নিয়ে এসেছেন— এক-আধজন নয়, ১৪০ জন। প্রাতরাশ থেকে রাতের খাবার আলাদাই সুস্বাদু হয়ে উঠবে। নিজের মনে অশ্লীল হাসি হাসলেন তিনি।

হেনকালে রাজপুত সৈন্যদের আগমন সংবাদ শুনে খানিকটা অবাক এবং বিরক্ত হলেন— তবে যে তাঁকে খবর দেওয়া হয়েছিল, ওই রাজপুত রাজা যোধার পুত্র শীতল রাঠোর মাত্রই কিশোর! এক কিশোর রাজা তাঁর মুখোমুখি হবে! যতদূর জানেন, এই রাজপুতরা সূর্য অস্ত গেলে অস্ত্রধারণ করে না। সেই সব রীতিনীতি কোথায় গেল? অবশ্য এসব রীতিনীতি ধার ধারেন না তিনি। তিনি আফগান যুদ্ধ-ব্যবসায়ী, যুদ্ধ তাঁর পেশাযখনই হোক, যেমনপরিস্থিতি হোক, তাঁকে যুদ্ধ করে খেতে হয়। প্রসন্ন মুখে উঠে পড়লেন, ধরাচুড়ো পরতে হবেআসন্ন যুদ্ধ জয়ের পৈশাচিক আনন্দ ফুটে উঠল মুখে।

 

***

আফগান সরদার গাদুলা খান একজন বৃষের ন্যায় পুরুষ। ইতিহাস তাঁকে দানব আখ্যা দেয়। সাতমণি ওজনের লোহার বর্ম আর রণকুঠার পরে তিনি নিজেই একটি দুর্গ।

সম্মুখে রাজপুত রাজা আর তাঁর মুষ্টিমেয় সৈন্যকে দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন তিনি, বৃদ্ধ রাও যোধার তরুণ পুত্র এই শীতল। মাত্র তিন বছর হল সিংহাসনে বসেছে। ক’টা যুদ্ধ করেছে তার ঠিক নেই, এ কিনা তাঁকে পরাজিত করবে! তিনি পাঁচশত লড়াই করেছেন। এই যুবক তো তাঁর কাছে নাবালকের অধম...

হুংকার ছেড়ে কুঠার নিয়ে লাফিয়ে পড়লেন রাও-এর উপর। ভাল্লুকের সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ যেমন অসম, প্রথমটা ঠিক তেমনভাবে হকচকিয়ে গেলেন রাও শীতল। কিছুতেই কায়দা করতে পারছিলেন না গাদুলাকে। মস্ত চেহারাটার আড়ালে যেন ঢাকা পড়ে গিয়েছিলেন তিনি।

সেই সুযোগে গাদুলাও উপর্যুপরি আঘাত করে চললেন। ভারী কুঠারের আঘাতে আঘাতে ভেঙে গেল রাওয়ের তরবারি। এদিকে গাদুলার কঠিন বর্ম ভেদ করা একপ্রকার অসম্ভবতবুও তরবারি, ছুরি দিয়ে চেষ্টার-পর-চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন রাও। একপর্যায়ে রাও বুঝলেন আজকেই তাঁর শেষ দিন। এই নরদানব যে আঘাত তাঁকে দিয়েছে তাতে করে প্রাণে বেঁচে ফেরা সম্ভব হবে না। কিন্তু তিনি ওই নারীদের অভিভাবকদের কথা দিয়ে এসেছেন। তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন...

শরীরের সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করে আপন ইষ্টকে স্মরণ করলেন তিনি। অস্ত্র ফেলে দিয়ে দুই হাতে চেষ্টা করলেন তার বর্ম খুলে ফেলতে। যেভাবেই হোক এই দুর্ভেদ্য বর্ম ভেঙে ফেলতে হবে।

অবশেষে খুলে ফেলতে সমর্থ হলেন গাদুলার শিরস্ত্রাণ। দুরন্ত গতিতে কোমর থেকে বের করে আনলেন কিরিচ। আঘাত করলেন গাদুলাকে। কিন্তু তিনি সত্যিই দানব, মুখের মধ্যে ছুরির আঘাত নিয়েও অবিচল রইলেন। লাফিয়ে তাঁর স্কন্ধে উঠে ছুরির আঘাতে আঘাতে শতছিন্ন করেন গাদুলার মাথা। লুটিয়ে পড়েগাদুলা। মুক্ত করেন নারীদের

তাদের হাতে তুলে দেন গাদুলার কর্তিত-মুণ্ড। সসম্মানে ঘরে ফিরিয়ে আনেন তাদের। সারা মারোয়াড় দেখে মায়েদের হাতে গাদুলার মাথা। সেই রাতেই শেষ নিশ্বাস নিলেন মাওয়াড় অধিপতি রাও শীতল রাঠোর ( ১৩ মার্চ, ১৪৯২)

 

এই দিনটি উৎসবের মাধ্যমে স্মরণ করেন মায়েরা। কুমোরদের থেকে বিশেষ হাঁড়ি বানানো হয়সেই হাঁড়িতে থাকে শত ছিদ্র। ঠিক যেমন ছিদ্র রাও করেছিলেন দানব গাদুলা খানের মাথায়, ঠিক তেমন। তারপর সেই হাঁড়ির মধ্যে বসিয়ে দেওয়া হয় একখানি প্রদীপ। প্রদীপের আলোয় দৃশ্যমান হয় সেই হাঁড়িটা থুড়ি গাদুলা খানের মাথাটা। সারা গ্রাম মায়েরা ঘুরে বেড়ান এইভাবে, কন্ঠে "গাদুলা ঘুমেলা" গান, যেন গাদুলা খানের মাথা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা। সময় চলে যায় আজ থেকে ৫০০ বছর আগে, ঠিক এমনিভাবে সেই রাতেও ফিরে এসেছিলেন তাদের পূর্বজরা...

আজ একবিংশ শতাব্দীর ভারতের পূর্বপ্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রণাম করি সেই রাজপুত বীরকে। ইতিহাস নীরব থাকুক, আমরা স্মরণ করব আমাদের পূর্বজদের।


___________________________________________________________________________


প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:

প্রথম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html

দ্বিতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html

তৃতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html

চতুর্থ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

পঞ্চম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

ষষ্ঠ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html 

সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html

অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html

নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html

দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html

ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html

চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html

পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html

ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html

সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html

অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html

ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html

বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html

একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html 

দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html

ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html

চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html

পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html

ষট্‌বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html

সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html

অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html

ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html

ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html

একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html

দ্বাত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post_14.html

ত্রয়োত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post_22.html

চতূস্ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/03/blog-post_2.html

পঞ্চত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/03/blog-post_15.html

ষট্ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/03/blog-post_29.html

সপ্তত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/04/blog-post.html

অষ্টত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/04/blog-post_12.html

ঊনচত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/04/blog-post_19.html

চত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/04/blog-post_26.html

একচত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/05/blog-post.html

দ্বিচত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/05/blog-post_17.html

ত্রিচত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/05/blog-post_24.html

চতুশ্চত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/05/blog-post_31.html

পঞ্চচত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/06/blog-post.html

ষট্‌চত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/06/blog-post_14.html

সপ্তচত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/06/blog-post_21.html

 

 

মন্তব্যসমূহ