প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান
তমোঘ্ন নস্কর
পঞ্চচত্বারিংশ
পর্ব: বাজরার দেশ
১৫৪৪ খ্রিস্টাব্দ। মাড়োয়ারের মরুভূমিতে সন্ধ্যার সূর্য
অস্ত যাচ্ছে। সন্ধ্যা, কারণ এই মস্ত ভারতভূমিতে সবচেয়ে দেরিতে
সূর্য অস্ত যায় এই মরুভূমিতে। ঢলঢলে রক্তরাঙা আলো মেখে বালির ঢিবিগুলো সোনার রং ধরল
যেন। হ্যাঁ, সোনাই বটে। মাড়োয়ারের এ ভূমি রুক্ষ্ম, বঞ্জর
কিন্তু তাদের মতো অজস্র অগণিত রাজপুতের কাছে স্বর্ণ সমান।
দুর্গের প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজপুত কুঁয়ার সিংহ। তাঁর বয়স কেবল
কুড়ি। সদ্য বিবাহ হয়েছে। কিন্তু স্ত্রী’র মুখের চেয়ে তিনি বেশি দেখেছেন তরবারির ফলক। বাবার অকাল
মৃত্যুর পর তাঁদের জমিদারির সরদার হয়েছেন
তিনি। এই স্বর্ণভূমি রক্ষার দায় তাঁর স্কন্ধে। নীচে ওই শিবিরে যে হাজার অশ্বারোহী, তারা তাঁর আজ্ঞাবহ। তাদেরকে তিনি নিয়ে এসেছেন যুদ্ধে।
শেরশাহ সুরি নিজে এগিয়ে এসেছেন। মাড়োয়ারের
অধিপতি রাও মালদেব যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছেন। শেরশাহের আফগান সৈন্যের সংখ্যা আনুমানিক
আশি হাজার। আর তাঁদের সব মিলিয়ে পঞ্চাশ হাজার তো হবেই। কাজেই
যুদ্ধটা কঠিন নয়। তার প্রমাণ তাঁরা শেরশাহকে বারে বারে দিয়েছে।
কিন্তু কঠিন হল শেরশাহের বুদ্ধি। মানুষটা সোজাসাপটা নয়। তার প্রমাণ রেখে গেছেন তিনি,
দিওয়ানার প্রচলিত পথ বেয়ে দিল্লি থেকে ভারী সৈন্যরা রাজস্থানের দিকে আসেনি। তারা ক্ষণে ক্ষণে পথ পরিবর্তন করছে। ছোটো ছোটো
দলে ভাগ হয়ে বায়ানা-র বিভিন্ন পথ বেয়ে রাজস্থানের
দিকে এসেছে। কখনও ভেঙে যাচ্ছে। কখনও যুক্ত
হয়ে মস্ত বড়ো অজগরের মতো গিলতে আসছে
মাড়োয়ার।
প্রথম ধাক্কাটা তাঁদের
জন্য খানিকটা অপ্রত্যাশিতই ছিল। সুমিলের গ্রামে আফগান সৈন্যরা ছাউনি গেড়েছিল।
রাও মালদেবের কঠিন নজর ছিল সেদিকে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয়েছিল আফগানরা চূড়ান্ত যুদ্ধের
প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ এক সকালে দেখা গেল সুমেল নদী বেয়ে মাড়োয়ারে পদপ্রান্তে একেবারে
গিরি গ্রামে এসে উপস্থিত হয়েছে আফগান সৈন্য। রাতারাতি নিঃশব্দে প্রায় ১২ মাইল পথ
তারা পার হয়ে এসেছে নৌকাযোগে। তবে সুবিধা বিশেষ কিছুই করতে
পারেনি, কারণ গিরি অঞ্চল রাজপুতদের বিচরণ ক্ষেত্র। কাঁটা ঝোপ আর ছোটো
ছোটো গাছপালায় ভরা মরুভূমির পাহাড়ি অঞ্চল। এই অঞ্চলে রাজপুত সৈন্যরা এক প্রকার
অপ্রতিরোধ্য৷ আফগান সৈন্যরা নৌকাযোগে আসার জন্য ভারী
অস্ত্র বহন করে আনতে পারেনি। ভারী বেকায়দায় পড়ে পিছু হটতে বাধ্য
হয়েছিল দিল্লীশ্বর।
তারপর তারা চেষ্টা করেছিল বিকানির আর
মেরটের জায়গীরের সঙ্গে অশুভ আঁতাত করতে কিন্তু সেই প্রচেষ্টাও
ব্যর্থ হয়। দীর্ঘদিন মরুভূমির মধ্যে আটকে থেকে বিপুল সৈন্য বাহিনীর জন্য খাবার আর
রসদ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ শেরশাহ কি এত সহজে ফিরে যাবে?
কেল্লায় এই ক’দিন বসে বসে সেই চিন্তাই
করে গেছেন কুঁয়ার। তিন দিন আগে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।
গভীর রাতে তিনি দুর্গের
বাইরে টহল দিচ্ছিলেন। হঠাৎ বালিয়াড়ির আড়ালে দুই ব্যক্তির
উপর তাঁর নজরে পড়ে। সর্বাঙ্গ কালো কাপড়ে ঢাকা মানুষ দু’টি গুপ্তচর নিঃসন্দেহে। কার সঙ্গে দেখা
করতে এসেছে তারা। কুঁয়ার তাদের অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু বালিয়াড়ির
ভিতর তারা যেন মিলিয়ে গিয়েছিল বেমালুম।
***
পরদিন মহাহুলুস্থুল পড়ে গিয়েছিল শিবিরে।
রাওয়ের শিবিকার চৌহদ্দিতে একটি চামড়ার থলে পড়ে ছিল। গত রাতে
এই থলেটি কেউ রেখে গিয়েছে। খুলে দেখা গেল, কয়েকটি চিঠি।
চিঠিগুলো পড়ে রাগে ঘৃণায় রাওয়ের বমন
উদ্রেক হল। রাজপুতরা এমনি করে নিজেদের বিকিয়ে দিল।
হ্যাঁ সেই চিঠিতে লেখা ছিল— রাজপুত সেনাপতি
জয়তা রাঠোর ও কুম্পা রাঠোর গোপনে শের শাহের সঙ্গে সন্ধি করেছেন।
সেনাপতি জয়তা বারংবার রাওয়ের কাছে তার
সততার প্রমাণ দিতে চাইল। রাও তো জয়তাকে চেনেন, যে মানুষ নিজের ভাইয়ের মৃত্যুর পরও
যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়েনি, সে বিশ্বাসঘাতক হতে পারে না।
রাও মালদেব নিজের প্রাণপ্রিয় সেনাপতিকে
কিছু বললেন না। এরা বিশ্বাসঘাতক সে-সন্দেহ
তিনি করতে পারেন না, কিন্তু ওই চিঠিকে তিনি অবিশ্বাস করেন
কীভাবে? এই হস্তাক্ষর জয়তার হস্তাক্ষরের সঙ্গে অনেকখানি মিলে যায়। সেদিন থেকেই সন্দেহের বিষ ছড়িয়ে পড়ল।
***
অবশেষে মাথায় বুদ্ধিটা খেলে গেল কুঁয়ারের।
সেদিন লোকদুটো আসার আগে একটা আলোর আনাড়ি রেখা দেখা গিয়েছিল, সেটাই সম্ভবত সংকেত।
সত্যিটা তাঁকে জানতে হবে।
একাই ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। শিবিরের বাইরে বেরিয়ে এসে একটি আলোর কুপি দিয়ে আড়াআড়ি
ঈঙ্গিত করলেন কুঁয়ার। সময় পেরিয়ে যায়,
তাঁর অস্থিরতা বাড়ে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে তেমনই চিহ্ন দিয়ে প্রত্যুত্তর আসে। হঠাৎ করে দেখলে আফগান শিবিরের সারি
সারি মশালের আলোর মধ্যে থেকে আলাদা করা যাবে না।
আলো লক্ষ করে বুকে হেঁটে সন্তর্পণে এগিয়ে
আসছিলেন কুঁয়ার। একটি পরিত্যক্ত কুয়োর পাশে কয়েকজন আফগান
সৈন্য দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁকে এগিয়ে আসতে দেখেই মুখে আলো ফেলল
তারা। চিনে গেল তাঁকে...
তিনি বুঝে গিয়েছিলেন ধরা পড়ে গেছেন। দৌড়ে শিবিরে ফিরতে চাইছিল তিনি। ঠিক
তখনই একটি বর্শা এসে তাঁর কাঁধ ভেদ করল।
***
রক্তাক্ত শরীরে, বর্শা বিদ্ধ অবস্থায়
নিজের শরীরটাকে টেনে টেনে যতক্ষণ কুঁয়ার কেল্লায় পৌঁছোলেন ততক্ষণে
অনেক দেরি হয়ে গেছে। রাও মালদেব ইতিমধ্যে মূল বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।
দিন শেষে সন্দেহই জিতে গেল। বিশ্বাস হেরে গেল।
জয়তা মৃত্যু পথযাত্রী কুঁয়ারের থেকে সবই
শুনলেন। তাঁরা দৃঢ় শপথ নিলেন, শেষ
রক্তবিন্দু দিয়ে এই গড়, এই স্বর্ণভূমি রক্ষা করে যাবেন। না-হলে
পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের বিশ্বাসঘাতক বলে জানবে। তাঁদের পরিবার নিমজ্জিত হবে অসম্মানের পঙ্কিল অন্ধকারে।
কুম্পা বললেন, কিন্তু
আমাদের সেনাবল কই? শেরশাহের আফগান বাহিনীতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার আর সৈন্য এখনও বেঁচে আছে। আর আমরা মাত্রই ৩০০০, ভারী আগ্নেয়াস্ত্র নেই যা আছে
এই সামান্য হাওদা বন্দুক, তির-ধনুক আর তরবারি।
জয়তা বললেন, আর আছে রাজপুত কেশরী। রাও বাপ্পার কেশরী শাকা।
সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক হাজার রাজপুত
অশ্বারোহী মরুভূমির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সমুখে শেরশাহের বিশাল বাহিনী। যেন মস্ত এক
অজগরের সামনে একটি পাহাড়ি ইঁদুর। কিন্তু তবু তাঁরা থামল না।
বালিতে আকাশ ঢাকল। তরবারির ঝলকানিতে বিজুরি চমকাল। কিন্তু কতক্ষণ? তাঁদের চারপাশের বৃত্তটা ছোটো হতে শুরু
করল। চারদিক থেকে শত্রু ঘিরে ফেলল। ক্রমাগত গোলাবর্ষণে গড়ের
দেয়াল ভেঙে পড়তে লাগল। আফগান রণহস্তীগুলো পিষে-দলে তছনছ করে দিল রাজপুতদের।
দিনশেষে শেরশাহ রণহস্থি থেকে নেমে হাঁটু গেড়ে বসলেন সেই প্রান্তরে। তাঁর সম্মুখে শত শত রাজপুত বীর
শুয়ে রয়েছেন। তাঁদের মুখের যন্ত্রণা নেই বরং ফুটে রয়েছে
একটুকু গর্বের হাসি।
যুদ্ধক্ষেত্রের মাটি মাথায় নিয়ে ধীর অবনত মস্তকে দিল্লীশ্বর
বললেন, “এক
মুঠো বাজরার দেশ আর সেই দেশের মানুষের জন্য আমি প্রায় হিন্দুস্তান হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
আজও ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে শেরশাহের
এই অকপট স্বীকারোক্তি। কিন্তু আমাদের গ্রন্থগুলিতে মহান বাদশাহ ওই যতখানি আলো পেয়েছেন,
রাজপুত বীরেরা তার বিন্দুমাত্র পাননি। তর্ক বলে, যে বেঁচে থাকে, ইতিহাস তাকে বিজয়ী
বলে। তারই ইতিহাস লেখা হয়। কিন্তু সেই বাজরার দেশের মাটি
বলে, যে বীর নিজের সম্মানের জন্য মরতে পারে, মানুষ তাকে অমর বলে। জয়তা রাঠোর, কুম্পা,
কুঁয়ার অমর। তাঁরা রয়ে যাবেন। ইতিহাসের বইয়ের পাতাগুলো হলুদ
হয়ে, ভাঁজে ভাঁজে ছিঁড়ে যাবে কিন্তু তাঁরা রয়ে যাবেন।
___________________________________________________________________________
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:
প্রথম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html
দ্বিতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html
তৃতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html
চতুর্থ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
পঞ্চম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
ষষ্ঠ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html
সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html
অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html
নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html
দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html
ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html
চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html
পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html
ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html
সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html
অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html
ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html
বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html
একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html
দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html
ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html
চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html
পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html
ষট্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html
সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html
অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html
ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html
ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html
একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html
