প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান
তমোঘ্ন নস্কর
পঞ্চাশৎ পর্ব: ভূতালার
প্রান্তরে
মরুভূমির রাত্রির
একটি নিজস্ব শব্দ আছে। দিনের বেলায় যে প্রান্তরটি রুক্ষ, নিষ্প্রাণ এবং অগ্নিদগ্ধ
বলে মনে হয়, রাত্রি নামলে সেই একই প্রান্তর নিমেষে বদলে যায়। বালির উপর দিয়ে বাতাস
বয়ে যায়, শব্দ ওঠে সাঁই সাঁই... শত শত রাজপুত বীরের শেষ নিশ্বাস মিশে আছে বাতাসে...
এটাই মরুভূমির শব্দ, তার হৃদস্পন্দন।
কিন্তু
না, রাতের এই নিস্তব্ধতা বেশিক্ষণ উপভোগ করা যায় না। নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হয় পাথরের
সঙ্গে ধাতুর সংঘাতের শব্দে— চিতোরের বুরুজে পাহারাদারের ঘোড়ার নালের শব্দ।
সেই
দিনও অমন। চাঁদহীন আকাশের নীচে আরাবল্লির কালো পাহাড়গুলি দূরে দাঁড়িয়ে ছিল
নির্বাক, প্রাচীন, অচঞ্চল। যথারীতি পাহাড়ের গায়ে চিতোরের দুর্গ তখনও জেগে। চর
মারফত সংবাদ এসেছে, দিল্লির সুলতান নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছেন কেল্লার প্রান্তে।
এত
নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল তাঁর যে সীমান্তে সদা সতর্ক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গুপ্তচরেরাও
বুঝতে পারেনি। অবশ্য তার কারণ আছে, ইতিপূর্বে যে সমস্ত শাসকেরা রাজস্থানের দিকে পা
বাড়িয়েছেন, তাঁরা এসেছেন অন্য দিক থেকে। বাইরের দেশ থেকে সুবিশাল সেনাবাহিনীর
ধ্বজা উড়িয়ে তাঁরা রাজস্থানের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন।
আর
ইলতুতমিস দিল্লির প্রথম স্বাধীন সুলতান। ভারতবর্ষের যে যে অঞ্চলে তাঁর কর্তৃত্ব
রেখে গিয়েছিলেন, সেই অঞ্চলগুলিতে শাসন চালাতেন কুতুবউদ্দিন আইবক। কুতুবউদ্দিন
আইবকের মৃত্যুর পর ছোটোখাটো যে সমস্ত শাসকেরা ছিলেন, তাঁদের পরাস্ত করে
পাকাপাকিভাবে দিল্লির সুলতান হয়েছিলেন ইলতুতমিস।
প্রথম
জীবনে তিনি দাস ছিলেন। সেই দাসত্ব থেকে লড়াই করে তিনি আস্তে আস্তে এই পদে উন্নীত
হয়েছিলেন। দুর্দান্ত সমরকুশলে মহম্মদ ঘোরিকে সন্তুষ্ট করা সোজা কাজ ছিল না। কাজেই
তিনি যে কতখানি দক্ষ সেনানায়ক, তা এখান থেকেই অনুমান করা যায়। এহেন মানুষের
যুদ্ধের চাল যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম হবে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তাঁর তখনও মহারাওয়াল
জৈত্রসিংহের সঙ্গে পরিচিত হওয়া বাকি ছিল।
উটপালকের
ছদ্মবেশে কিছু মানুষ আশপাশের গ্রামগুলিতে প্রবেশ করেছে এবং তাদের পিছু পিছু বাহিনী
আসছে— এই খবরটি যখন মহারাওয়াল জৈত্রসিংহের কাছে পৌঁছোল, তখন রাত প্রায় শেষ।
***
জৈত্রসিংহ
অনেকক্ষণ ধরে মানচিত্রটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেনাপতিরা কোনও আশ্বাসের কথা দিতে
পারছে না। তারা কেবল সাহস আর বলিদানের কথাই বলে যাচ্ছে। কিন্তু সাহস আর বলিদান
দিয়েই তো সব হয় না! যদি প্রজাই না থাকল, তা হলে সহস্র বলিদান দিয়ে রাজত্ব রক্ষা
করে লাভ কী হল? রাজা তো প্রজার জন্যই বেঁচে থাকেন।
তবে
এ কথা সত্যি, দিল্লির সুলতানের বাহিনী সংখ্যায় মেবারের চেয়ে অনেক বেশি। তুর্কি,
তাতার, উজবেকের মিলিত অশ্বারোহী বাহিনীও শক্তিশালী। মেবারের পক্ষে যুদ্ধ সহজ হবে
না। কিন্তু যুদ্ধের হিসাব কেবল সৈন্যের সংখ্যা দিয়ে হয় না।
হেনকালে
রাজার কক্ষে প্রবেশ করলেন মহাসেনাপতি, "শত্রুর
অগ্রবর্তী বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করেছে।"
মানচিত্রে
চোখ রেখেই তিনি জবাব দিলেন, "কত দূরে?"
"দেড় দিনের পথ। তবে যদি তারা দ্রুত অগ্রসর হয়, তারও কম।"
মহারাওয়াল
এবার ধীর, শান্ত, দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, "তা
হলে আজ রাত থেকেই যুদ্ধ শুরু হল। অগ্রবর্তী পথের প্রতিটি কূপের জল সরিয়ে দেবে, যত
শ্রমিক সম্ভব কাজে লাগাও, রাতারাতি খাল তৈরি করো। সমস্ত জলকে চিনি মেবারের
কাছাকাছি একত্রিত করো। গ্রামগুলিকে দুর্গের মধ্যে নিয়ে এসে রসদশূন্য করো। এতদিন
রাজপুত যা করেনি, আমরা তাই করব। রাতের অন্ধকারে তাদের অশ্বারোহীদের বিশ্রাম নিতে
দেব না। পাহাড়ের পথ তারা জানে না, আমরা জানি।"
সেনাপতি
চমকে উঠলেন। সেনাপতির কাঁধে হাত রেখে মহারাওয়াল বললেন,
"সেই রাতে পৃথ্বীরাজ চৌহানের সঙ্গে এদেরই পিতৃপুরুষ অন্যায়
যুদ্ধ করেছিল। কেবলমাত্র নিজেদের রীতি বজায় রাখতে গিয়ে রাজপুত রাজ্যের স্বাধীনতার
সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়েছে। বারবার এই একই ভুল করা যায় না। পুত্রের ঋণ পিতাকে শোধ
করতে হয়— এটা দু’জনের ক্ষেত্রেই অনন্ত সত্যি।"
***
পরবর্তী দেড় দিন
মেবারের সীমান্তে অদৃশ্য যুদ্ধ চলল।
দিল্লির
বাহিনী যখনই কোনও গ্রামে পৌঁছোয়, দেখে গ্রাম শূন্য। শস্য নেই। পানীয় জল নেই। গবাদি
পশু নেই। একটি পাখিও যেন নেই।
তারা
একটা জিনিস লক্ষ করল, প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধ্যার সময় দূরের পাহাড়ের গায়ে ধোঁয়া
উঠতে দেখা যায়। অনুমান করল, পাহাড়ের ওই কাঁটা জঙ্গলের ভিতরে গ্রামবাসীরা আশ্রয়
নিয়েছে। সুলতানের সৈন্যরা যখন সেই দিকে অগ্রসর হয়, তখন ধোঁয়া মিলিয়ে যায়।
পাহাড়ের
চারিদিকেই বসে রইল তারা। এ তাদের ভূমি নয়। কিন্তু তারা এত সহজে ছাড়বে না। তারা
দুর্ধর্ষ তুর্কি, তাতার, মামলুক বাহিনী। তারা এক প্রকার অপরাজেয়।
রাত
নামলেই শুরু হয় আক্রমণ। পাহাড়ি জঙ্গলে এমনধারা আক্রমণে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়
তারা। এমন এক শত্রুর দেশে প্রবেশ করেছে, যে শত্রু সামনে এসে সরাসরি যুদ্ধ করছে না,
কিন্তু চারদিক থেকে তাদের ঘিরে আছে।
এই
যুদ্ধের নাম নেই। কোনও রাজদরবারের ইতিহাসে তার বিবরণও হয়তো লেখা হয়নি। কিন্তু
মেবারের দেওয়ালে কান পাতলে তার লোককথায়, গাথায় এই অবিশ্বাস্য কথার ফিসফিস শুনতে
পাবেন।
এইভাবে
বেশ কিছুদিন সুলতানের বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করার পর দুই বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি
হয়েছিল ভূতালার প্রান্তরে।
এক
মরুঝড়ের দিনে রুক্ষ মরুভূমি যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল প্রাণের স্পন্দনে। লক্ষ
অশ্বখুরের বালি আকাশ ঢেকে দিল। তির আর বর্শায় আচ্ছন্ন হল চরাচর। হস্তীর বৃংহণে
কেঁপে উঠল চরাচর। সন্ধ্যার প্রাক্কালে আরাবল্লি যখন শেষ বিকালের রক্তিম আলো গায়ে
মেখেছে, যুদ্ধক্ষেত্রের উপর ধুলো ধীরে ধীরে বসে এল। দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে রাজপুত
বাহিনীর অন্তিম অংশ প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তিম যুদ্ধের... তারা আশ্চর্য হয়ে খেয়াল
করল— দিল্লির বাহিনী আর এগিয়ে আসছে না।
মেবার
দাঁড়িয়ে আছে তার জায়গায়। পরাজিত নয়, অবনত নয়, আবার জয়ীও নয়। ইতিহাসের পাতা সবসময়
অমীমাংসিত যুদ্ধের নায়কদের নাম বড়ো করে লেখে না।
কিন্তু
কখনও কখনও এমন যুদ্ধও হয়, যার ফলাফল কোনও সাম্রাজ্যের পতন কিংবা কোনও নতুন
রাজবংশের সূচনার জন্য নয়; তার উদ্দেশ্য কেবল শত্রুকে জানিয়ে দেওয়া যে, তুমি যত
শক্তিশালীই হও, এই মাটিতে তোমার ইচ্ছাই শেষ কথা নয়। এই মাটি আমার মা, আর
মাতৃদুগ্ধে আমার জন্মগত অধিকার।
মহারাওয়াল
জৈত্রসিংহের নাম আজ ইতিহাসের বিস্মৃত প্রান্তে। পৃথ্বীরাজের মতো তাঁর কাহিনি শিশুর
মুখে মুখে ফেরেনি। রানা প্রতাপের মতো তাঁর অশ্বের নাম কিংবদন্তি হয়নি। কিন্তু
ভূতালার প্রান্তর এখনও আছে।
বহু
বছর আগে এক শীতে জিপ থেকে নেমে, সেই প্রাচীন পাথুরে ভূমির দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল,
কোনও এক দূর অতীতের সন্ধ্যায় সেখানে ধুলোয় ঢাকা এক রাজপুত রাজা দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তাঁর সামনে ছিল দিল্লির বিপুল বাহিনী।
আর
তাঁর পিছনে তাঁর ছোট্ট রাজ্য— তাঁর মায়ের ঘর। আর মা-কে আগলে রেখেছিল মেবারের এই
রুক্ষ পাহাড়।
মেবারের
মহারাওয়াল জৈত্রসিংহ (Jaitrasimha) এক বিস্মৃত
রাজা।
তেরোশো
শতকের প্রথমার্ধে দিল্লির সুলতান ইলতুতমিসের মেবার আক্রমণের বিরুদ্ধে তিনি
প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ১২২২–১২২৯ সালের মধ্যে সংঘটিত ভূতালা যুদ্ধের নেতৃত্ব
দিয়েছিলেন তিনি। সেদিন মেবারের পক্ষে গুহিল, চাহমান, পরমার ও অন্যান্য রাজপুত
শক্তির সহযোগিতার কথা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। আক্রমণকারীরা শেষ পর্যন্ত তাদের
উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি এবং পিছু হটে। তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরী মহারাণা প্রতাপ।
প্রতিরোধের বীর সন্তানকে স্মরণ ও প্রণাম।
___________________________________________________________________________
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:
প্রথম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html
দ্বিতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html
তৃতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html
চতুর্থ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
পঞ্চম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
ষষ্ঠ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html
সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html
অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html
নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html
দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html
ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html
চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html
পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html
ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html
সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html
অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html
ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html
বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html
একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html
দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html
ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html
চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html
পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html
ষট্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html
সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html
অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html
ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html
ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html
একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html
