মহালয়া: সেই ছেলেবেলার দিনে… - বাসুদেব ঘোষ
মহালয়া: সেই ছেলেবেলার
দিনে…
বাসুদেব ঘোষ
আশ্বিনের শেষ।
বর্ষা বিদায় নিয়েছে। আকাশের অতলান্ত সুনীল নীলিমায় বিচরণ করছে ছোটো,
বড়ো, মাঝারি মেঘের দল। ইতস্তত পেঁজা তুলোর পসরা
নিয়ে পানসি ভাসায় সাদা মেঘের পুঞ্জ। তারা ‘গাভীর মতো চরে’ বেড়ায় নীল
ক্যানভাসের উপর। দিঘির কালো জলের আরশিতে মুখ দেখে। ঝরে পড়ে মিষ্টি আদরের মতো
হালকা দু’-এক পশলা বৃষ্টি নিয়ে। শরৎকাল জানান দিয়ে যায়। কুসুমবীজের মতো রং ধরে
সকালের রোদের। নাকি শনফুলের রং। সবুজ পাতায় পাতায় ঝিলমিলিয়ে ঝিলিক দিয়ে যায়
অতসী পুষ্পবর্ণ... আতপ। মা আসছেন। মায়ের গাত্রবর্ণ যে অতসী পুষ্পের ন্যায়।
হাওয়া বদলের সময় এখন। হিমের পরশ ভোরের বাতাসে।
জমিনে
সুবিস্তৃত সবুজ গালিচা। সবুজ ফসলের খেত। ধান আর পান। টাল খায় কমলের কোরক। ঝিলের
জলে চুম্বন এঁকে যায় কমলসুবাস। জলে মেশে পদ্মের সুঘ্রাণ। সুবিস্তৃত সবুজ মাঠের
উপর দিয়ে বাতাস লহরী তুলে মিলিয়ে যায় দিগন্তে। সবুজ আর পঙ্কজের পরশ-গন্ধমাখা
বাতাস টলটলে দিঘির বুকে মৃদুমন্দ আলোড়ন তোলে। বৃত্তের আলপনা আঁকা হয় মৃণালদণ্ডের
নৃত্যের তরঙ্গে, জলতলের সমতলে। দোদুল দোলনায় দুলে দুলে
শালুক আর পদ্মবনে হিন্দোল ওঠে।
জলের
কম্পন ছড়িয়ে যায় বাতাসের অনুরণনে। আধফোঁটা পদ্ম আর নীলশালুকের কুঁড়ি হাসে। যেন
দোলনায় ‘কচি-কলি’র দেয়ালা। শিশিরের পরশ পেতে জলের ’পর অধর মুখিয়ে থাকে
বারি-পুষ্পের দল। ‘দল’ প্রস্ফুটিত করে শিশিরস্নাত কুঁড়ি,
কুসুমে কুসুমিত হবে। মৃদু সৌরভ তখন শরতের আকাশে-বাতাসে। সেই
পদ্মগন্ধমাখা সুবাস বাতাসের ভেলায় গাঁয়ের কুটিরে, পথে,
প্রান্তরে; নগরের সরাইখানায়, জীবনযাত্রায়। মানুষের মনের অন্দরে প্রবেশ করে উৎসবের বার্তা।
উৎসবের
সূচনা ঘোষিত হয় কাশের মাথায় মাথায়। মায়ের আগমনবার্তা প্রকাশ পায় শিউলির
তলায়। অম্বরের আননখানি সুবাসিত দীর্ঘিকার জলের উপরিতলের দর্পণে আপতিত হয়। যেন
প্রসাধনের পরে অঙ্গসজ্জা দর্শন। জলদর্পণে ছায়া পড়ে মেঘেরও। দিঘিও তাইতে কালোর
মাঝে নীল-সাদায় লুকোচুরি।
উঁচু
পুকুরের পাড়ে ঢাকের পালকের মতো দুলছে কাশের দল। একমুখী,
বাতাসে উত্তুরে টান। সাদা মেঘের পেঁজা তুলো নদীর পাড়ে ছড়িয়ে
রয়েছে। “আজ যেমন করে গাইছে আকাশ...” বাতাসে ভেসে সেই সংগীতের আবহ। ছড়িয়ে পড়ে।
ছাড়িয়ে যায় বসতির সীমারেখা। পল্লিবালার কুটিরে মহাসংগীত ভেসে আসে। জগন্মাতার
আবাহনী সুর: “শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও, জননী এসেছে দ্বারে...”
নিতান্তই
একটি গ্রামীণ চালচিত্র। একটি ছেলে, ছোটো।
হাফ প্যান্ট। সুতির জামা। খালি পা। হাতে একটি ভাঙা ডাল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সদ্য
শেষ হয়েছে হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষা। আর কয়েক দিন বাদেই পুজোর ছুটি। পাড়ার মণ্ডপে
দু’মৃত্তিকালেপন হয়ে গেছে প্রতিমার। রংটাই যা বাকি। এ-পাড়া, ও-পাড়া চলছে যাওয়া-আসা। ঠাকুরের মুখ তখনও বসানো হয়নি। বন্ধুদের ‘আপডেট’
দেওয়া চলছে সমানে: “দেখেছিস, ও-পাড়ায় অসুরের তেজ! ইয়া
বুকের ছাতি, হাতের গুলি।” বাকিরাও থেমে থাকবে নাকি! বন্ধুদের
একজন কিছুতেই মানতে পারে না বিজাতীয় একটা গোলমাল। নিত্যি দু’বেলা মোষের পিঠে চড়ে
সে। “মহিষাসুরের কেবল ওই মাথাটুক, কেনে মোষটা গোটা থাকলে কি
অসুবিধা হত! সিংহের বেলায় তো তা নয়।” গভীর আক্ষেপ গলায়।
ছেলেটি
কয়েক দিন ধরেই খুব উত্তেজিত। রেডিয়োতে ঘোষণা হয়ে চলেছে: মহালয়ার পুণ্যপ্রভাতে
বিশেষ প্রভাতি অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। টিভিতেও হবে কিছু।
আগের
দিন রাতে একটু তাড়াতাড়ি শোয়া। আগামিকাল ভোর ভোর উঠতে হবে যে। রেডিয়ো বাজে
প্রতিদিন। তবুও রেডিয়ো চেক করা হয়েছে আগের দিন যথারীতি। ব্যাটারি ঠিকমতো আছে তো!
অন-অফের সুইচ কাজ করছে?
মনে
একরাশ উত্তেজনা নিয়ে বিছানায় যাওয়া। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়ে একরত্তি। ঘুমের
ঘোরে জেগে ওঠে আধোতন্দ্রায়। আবার ঘুমিয়ে পড়া। টিভিতে গতবারের দেখা অনুষ্ঠান।
প্রবল যুদ্ধ দেবী আর মহিষাসুরের মধ্যে। ছেলেটি যেন স্বচক্ষে দেখছে সেই অসম সমর।
একজন অসামান্য বীর। যুযুধান অপর পক্ষ ঐশীশক্তিসম্পন্না। ছেলেটি যুদ্ধ ভালোবাসে।
কিন্তু অসম সমর নয়। সমানে সমানে। বাঘা বাঘা দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির বলেই
বলীয়সী দেবী। তবুও বুক চিতিয়ে লড়াই দিচ্ছে মহিষাসুর। বীর বটে!
সামান্য
শীতভাব ভোরের বাতাসে। হঠাৎই শাঁখের আওয়াজ। আধোঘুম থেকে জেগে ওঠা। পাড়ায় সব ঘর
থেকেই ভেসে আসছে শাঁখের আওয়াজ। ছেলেটি বুঝতে পারে, রেডিয়োর
‘অনুষ্ঠান’ শুরু হয়ে গিয়েছে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে বিছানায়। নিস্তব্ধ শেষরাতে
ছড়িয়ে পড়েছে এক অলৌকিক দেবোত্তম স্বর: “আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে
আলোকমঞ্জীর...” একই সঙ্গে বাজছে প্রত্যেকটি ঘরে। অনুরণন হচ্ছে। ভরাট জাদুকণ্ঠ
ছুঁয়ে যাচ্ছে আসমান। ছেলেটির মনেও অনুরণন হচ্ছে অদ্ভুত এক আবেশ। আমেজ লাগছে
অন্যমনে। ছেলেটির মাথা আবার লুটিয়ে পড়েছে বালিশে। আধোতন্দ্রায় শুনছে: “বাজলো
তোমার আলোর বেণু...” দিদির স্নেহমিশ্রিত অনুযোগ: “তুই আবার ঘুমিয়ে পড়ছিস... কাল
যে বললি, জেগে থাকবি, ‘মহালয়া’
শুনবি...”
আবার
জেগে ওঠে ছেলেটি। রেডিয়োতে তখন মহামায়ার আবাহনী। “জাগো দুর্গা,
জাগো দশপ্রহরণধারিণী।” একটু ভাষ্য পাঠ। নিবেদিত এক কণ্ঠ। সমবেত
কণ্ঠের মাধুর্য... “ইয়া চণ্ডী...”
অনিবার্য
প্রহর-প্রতীক্ষা। শ্রীশ্রীচণ্ডী থেকে পাঠ: “ইয়া দেবী সর্বভূতেষু...” পাড়ায়
বাতাসে ভাসছে... মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে... শিবঠাকুরের আপন দেশে... পৌঁছে যাচ্ছে
সে-বেদবার্তা। সেই দেশে তখন হয়তো প্রস্তুতি নিচ্ছেন জগন্মাতা। পুত্রকন্যাদের
উপদেশ দিচ্ছেন: “মামাবাড়িতে সারাক্ষণ খেলে বেড়াবে না,
টই টই করে ঘোরাও চলবে না, বুঝেছ!”
ছেলেটির
হাপরবুকে কাঁপন জেগেছে। ওই তো একরত্তি বুকের খাঁচা। থেকে থেকে শিউরে উঠছে সেই
খাঁচা। শ্রীশ্রীচণ্ডী থেকে পাঠ হচ্ছে উদাত্ত কণ্ঠে। যিনি পাঠ করছেন,
তিনি কি উপর থেকেই এসেছেন? মা-ই কি পাঠিয়েছেন
তাঁকে? নইলে কণ্ঠ এমনি ধ্বনিত হয় কীসে! মেঘমন্দ্রিত দেবকণ্ঠ
চমকিত হয় শ্রীশ্রীচণ্ডীর পুণ্যশ্লোকে। আবেশ লেগে যায় অর্বাচীন একরত্তির। রেশ
রয়ে যায় সারা তনুমনে। সুরের মাধুর্য: “বাজলো তোমার আলোর বেণু...”
আলোর
বেণু ছড়িয়ে পড়েছে বাইরে, বহির্লোকে। অন্দরে নিকষ!
একটু একটু ফরসা হয়েছে আকাশ। শ্লোক, তত্ত্ব, আখ্যান। এত বোঝার বয়স নেই। বোঝেও না। কিন্তু শুনতে ভালো লাগে। মেঘের মতো
কণ্ঠস্বর ওঠানামা করে। কখনও আনন্দ উছলে পড়ে, আবার কখনও
নিজেকে নিবেদন সেই মহামায়ার শ্রীচরণে— ধরা গলার স্বরে ঝরে পড়ে অসীম আকুতি।
ছেলেটি
অপেক্ষা করে কখন ওই বাণী প্রতিধ্বনিত হবে: “গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধু যাবৎ
পিবাম্যহম্।”
শোনামাত্র
ছেলেটির চোখে দুর্গামায়ের চালচিত্র ভেসে ওঠে। উদ্ধত ত্রিশূল হাতে জগন্মাতা।
পায়ের কাছে মহিষাসুর। পরাজিত মহিষাসুর! কিন্তু চোখের দৃষ্টিটা তো পরাজিতের মতো
নয়। আশ্চর্য বীরভাব মহিষাসুরের চোখে। বাবরি চুল আর হাতের পেশিগুলির সঙ্গে ওই চোখ
মানানসই যেন। মহিষাসুরের প্রতি ছেলেটির খুব মায়া আছে। সে খালি ভাবে,
সব দেবতাদের সম্মিলিত তেজে মহামায়ার আবির্ভাব। তারপর আবার দশ-দশটা
হাত। সবাই অস্ত্র সমর্পণ করছেন সেই মহাদেবীর প্রতি। গিরিরাজ সিংহ তার বাহন। গতবার
টিভিতে দেখেছিল, আবছা মনে আছে।
মহিষাসুর
তো দেবতা নন! তিনি বীর। তিনি লড়বেন কী করে অসম অপরাজেয় ঐশীশক্তির সঙ্গে। তবুও কী
বীরবিক্রম! “রণং দেহি।”
মহিষাসুরকে
ত্রিশূলবিদ্ধ করছেন দেবী দুর্গা। অসহায় আত্মসমর্পণ নয়,
যুদ্ধং দেহি মনোভাবে পরাজয় স্বীকার। দৃশ্যটা তার চোখের সামনে চলে
আসে। শিউরে ওঠে মন। শিহরিত হয় গা। বারবার।
আবার
ঘুম নেমে আসে চোখে...
ঠিক
ঘুমও আসে না। সুরের মূর্ছনায় ভালো লাগে খুব। আবার ইচ্ছে করলেও জেগে থাকতে পারে না।
তারপর
একসময় শেষ হয় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।
মহালয়ার
পরের দিনের সকাল। নতুন সূর্যের চকমিলানো আলোয় ভাসছে তাদের গাঁয়ের লাল সরান,
সবুজ মাঠ, টলটলে পুকুর। গাঁয়ের উত্তরে যে
অজয় নদীর বাঁধ, সেই বাঁধে আলোছায়া খেলে সকালের সোনা-রোদ।
নতুন আলো মনে হয় তার।
বাতাসে
পুজো পুজো গন্ধ।
পোঁটলায়
বাঁধা নতুন জামা-প্যান্ট। লুকিয়ে লুকিয়ে খুলে একবার করে শুঁকে দেখা। ছেলেটির মনে
হয়,
মহালয়া হয়ে গেল, মানে পুজোও শুরু হয়ে গেল।
তখনই দিদির কাছে বায়না: “নতুন জামা বের করে দে!”
সে-আবেদনে
সাড়া পড়ে না। বড়োরা কেন যে বড়ো হয়ে যায়!
শেষ
হয়েছে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।
অনেক
বছর পার হয়ে গেছে। মহালয়ার ভোরের ছবিটা খুব একটা বদল হয়নি। সেই এক আবেশ। একই
অনুভূতি।
***
কিন্তু
পোঁটলা খুলে নতুন জামা পরার ইচ্ছেটা কেবল অন্তর্হিত হয়েছে। পোঁটলা নেই আর। রঙিন,
সুবেশ বিগ শপারে বন্দি পুজোর আশনাই। একটা নয়, অনেকগুলো। অনেক রকম। তবুও সেই ছেলেটির নাকে সেই পুরোনো গন্ধ লেগে আছে
অমলিন।
সকলকে
শারদ শুভেচ্ছা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন