শ্যামা মা কি আমার কালো - বাসুদেব ঘোষ

 




শ্যামা মা কি আমার কালো


বাসুদেব ঘোষ


মাইকে বাজছে, “ওরে নবমী নিশি, না হইও রে অবসান।” নিশি পোহালে দশমী।

দেবীপ্রতিমার ভাসান হয়ে যাবে। বড়ো দুঃসহ বেদনা প্রাণের মাঝে। বুকটা কেমন হু হু করে, খালি খালি লাগে সব। খাঁ খাঁ করে নাটমন্দির। মা যখন ছিলেন, আটনে কী যে অপূর্ব শোভা! ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করত না। দিনরাত আটচালাতেই পড়ে থাকা। খেলা আর খেলা। সমবয়সি বয়স্যরা, কাছে কাছে। সবারই একই অবস্থা। মণ্ডপ ছেড়ে কেউ আর বাড়ি যেতে চায় না। এদিকে পুঁটির মা ডেকেই চলেছে, “আয় মা, একবার। সেই কখন সকালে দু’টি চা-মুড়ি খেয়ে বেরিয়েছিস। চারটি খেয়ে নিয়ে আবার খেলগে।”

কে শোনে কার কথা! পুঁটি তখন মত্ত গভীর তত্ত্ব-আলোচনায়। বিষাদের সুর তার কথায়, “আজ তো নবমী। কালকেই যে মায়ের যাত্রা। মা আর থাকবেন না আমাদের মাঝে।”

শ্যামার চোখ লাল হয়ে ওঠে। রক্তাভ নয়নযুগলে উপচে পড়ে অশ্রু। অব্যক্ত যন্ত্রণায় ফুলে ফুলে ওঠে সে। কাঁদতে পারে না। সে শুনেছে, কাল সকালেই নাকি হবে শুভযাত্রা। সংসারের মঙ্গলকামনায় একটি মুদ্রায় মায়ের পায়ের সিঁদুর ঠেকিয়ে লক্ষ্মীর কাছে রাখা। তারপর নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে দেওয়া হবে। সেই পাখি গিয়ে কৈলাসে খবর দেবে, “আশুতোষ মহেশ্বর আসছেন তিনি ফিরে। স্বগৃহে। সপুত্র, সকন্যা, সবাহন।”

রামা একটু বড়ো। মাথাতেও। চোখ দু’টি বড়োই মায়াবী, যেন অতলান্ত সরোবর। সে অমনি বলে, “খবর পাওয়া মাত্র শিবঠাকুর ঘরদোর ঝকঝকে তকতকে করে রাখবেন। নেশার জিনিসপত্র সরিয়ে নেবেন। নইলে মা দুর্গা রেগে আগুন হয়ে যাবেন। তিনি রাগলেই উগ্রচণ্ডা। চণ্ডবিনাশকারিণী।”

একরত্তি পুঁচকে স্বরূপ শুনছিল এতক্ষণ। সে চণ্ডীকে চেনে। ও-পাড়ার ছেলে। সে বলে বসে, “কিন্তু উগ্রচণ্ডা আবার কে? সে কি মা দুর্গারই রূপান্তর?”

আর জানে না ওরা। ওদের সামান্য জ্ঞানে কুলোয় না বাকি কথা। আটচালাতে বসে এতক্ষণ ওদের কথা শুনছিলেন পাড়ার মুরুব্বি রথীনদাদু। সবাই মিলে গিয়ে ধরে দাদুকে। দাদু ধুয়ো ধরেন। ওরা বসে পড়ে দাদুকে ঘিরে। গোল হয়ে। মধ্যমণি দাদু।

চোখে অপরিসীম বিস্ময় ফুটিয়ে তোলেন, অকৃত্রিম। তারপর দাদু বলে চলেন, “উগ্রচণ্ডা দেবী দুর্গারই এক রণরঙ্গিনী রূপ। এই রূপেই তিনি বধ করেন মহিষাসুরকে। বিভিন্ন পৌরাণিক বর্ণনায় তিনি রণচণ্ডী। অঞ্জনবর্ণা মানে মিশকালো তাঁর বরণ। আবার কোথাও তিনি অগ্নিবর্ণা। তাঁর হাতে খড়্গ। রৌদ্ররূপা প্রচণ্ডা দেবীর আঠেরোটি বাহু।”

“দাদু, তিনি কি তবে মা কালী? কিন্তু মা কালীর তো চারটে হাত, মাত্র।”

সে-সব বড়ো জটিল তত্ত্ব-আলোচনা। ওদের কচি-মাথায় ঢুকবে কী করে! তবুও রথীন ঘোষ নিজের মতন ভাসেন। নিজের গতেই চলেন। প্রবাহের মতো।

“আদিশক্তি আসলে জগন্মাতার স্ফুরণ। পরাশক্তির দিব্য প্রভাব শক্তিতে। সৃষ্টির মূলে সেই তত্ত্ব। দেবী মহামায়ার অপূর্ব জ্ঞানদায়িনী দিব্যরূপ। সেই মহাজ্ঞানের আকর দশরূপে বিদ্যমান। দশমহাবিদ্যা। বিদ্যা আসলে জ্ঞানের আলোকিত প্রকাশ। দশমহাবিদ্যাও তাই। যোগমায়ার দিব্য জ্ঞানশক্তির মহাপরাক্রমশালী অবস্থান।”

এ যে চরম, সারের সার। সাধারণে বুঝবে কী করে?

আটচালার বাইরে তখন দক্ষযজ্ঞ বেঁধেছে। একেবারে শোরগোল তুলে দিয়েছে যেন।

“হেই গো রথীনকাকা, ছেল্যাগুলোকে সেই থেকে গপ্পো বলে আটকে রেখেছ! বলি, ওদের কি খাওয়া-টাওয়া নাই! বলিহারি বাপু।”

পাশ থেকে ফোড়ন কাটেন তেএঁটে দিনুকাকা, “নবমীর পুজোপাঠ চলছে। মহানবমীবিহিত পুজোআচ্চা, হোম। আর দ্যাখো! যেন দক্ষযজ্ঞ চলছে। দিনকাল ভালো নয় মোটেই।”

বুড়ো রথীনদাদু খেই পেয়ে যান, “ওই ওই! যা বললে। ওই যজ্ঞটাই সবের কারণ।”

“কাকা, তাই নাকি? দক্ষযজ্ঞের কারণেই এতসব! একটু শুনি...”

“প্রজাপতি ব্রহ্মার পুত্র দক্ষ। প্রবল অহংকারী। দক্ষের কন্যা সতী। বাপের কনিষ্ঠা কন্যা। আদুরে রাজপুত্রী। যা হয়! সতী মোহে পড়েন মহাদেবের। বাপের অমতে বিয়ে হয়। প্রাচুর্যহীন, সাদাসিধে ভোলানাথকে জামাতা হিসাবে মানতে অপারগ দক্ষ।

“মহাদেবকে চরম অপমানের জন্য আয়োজন করলেন বিশাল এক যজ্ঞের। সকলকেই নিমন্ত্রণ করলেন সেই যজ্ঞে উপস্থিত থাকার জন্য, একমাত্র নিজের কন্যা সতী আর জামাতাকে ছাড়া। শিবহীন যজ্ঞ। খবর পেলেন মহামায়া সতী। ‘বাপের বাড়ি যেতে কি নেমন্তন্ন লাগে!’ উঠে পড়ে লাগলেন শিবকে নিয়ে সেই মহাযজ্ঞে উপস্থিত থাকতে। বাপের বাড়ি মহা অনুষ্ঠান। সেখানে না গিয়ে কি পারা যায়?

“ভোলানাথ, আশুতোষ। স্বল্পে সন্তুষ্ট। নিতান্ত সাদামাটা। কিন্তু প্রবল আত্মসম্মানবোধ আর ব্যক্তিত্বে বজ্রসম। কিছুতেই রাজি হলেন না নিমন্ত্রণহীন অনুষ্ঠানে হাজির হতে। এদিকে সতীও নাছোড়। বারংবার নিষেধ সত্ত্বেও সতী ঠিক করলেন, তিনি যাবেনই। আর একাই যাবেন।

“এবার হুংকার ছাড়লেন রুদ্রভৈরব। ‘এই আমি রইলাম, দাঁড়িয়ে, দরজায়। কই যাও দেখি! অবলা নারী। সে কিনা একাই যাবে! কী দুঃসাহস!’

“মহাদেব হয়তো বিস্মৃত হয়েছেন সতীর সত্তা। সতী যে আদ্যাশক্তি মহামায়া। জগন্মাতা। জগতে পরাশক্তির যে নিয়তপ্রবাহ চলেছে, তার নিয়ন্তা। পরমাপ্রকৃতি নারী অনন্তশক্তির আধার। সেই শক্তি মুক্তিদায়িনী। মোক্ষপ্রদায়িনী।

“শক্তি আর পরাক্রম। দ্বৈরথ সমর। শিব-পার্বতীর।

“নিরুপায় সতী নিজ দেবীশক্তির প্রকাশ ঘটালেন এবার। দশটি রূপ পরিগ্রহ করে দশ দিক থেকে শিবকে অবরুদ্ধ করে ফেললেন। সেই দশরূপের কোনওটি বীভৎস। কোনওটি ভয়াল। আবার কোনওটি লাবণ্যময়ী মাতৃমুক্তি। পরাশক্তির পরম জ্ঞানরূপী প্রকাশ। আদ্যাশক্তি বিদ্যারূপে প্রতীয়মানা। শক্তির আবর্তে অবরুদ্ধ হলেন দেবাদিদেব। ভীত হলেন। মহামায়া যোগমায়ার সনাতনী শক্তিতে আচ্ছন্ন। বিস্মৃতি অন্তর্হিত হল। সতী পরমাশক্তি, প্রবলা প্রকৃতি। তাঁকে কে আটকাবে? সতী পাড়ি দিলেন বাপের বাড়ির পথে... তারপর...”

সে অন্য কথা।

সতীর নারীশক্তির এই যে দশটি প্রকাশ, এই-ই দশমহাবিদ্যা। দশমহাবিদ্যার প্রথম প্রকাশ কালী।

কালী সংহারক। কালী বরাভয়প্রদায়িনী। কালী সৃজনের দেবী। তিনি চতুর্ভুজ। ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ। তিনি সৃষ্টি, স্থিতি, বিনাশ, কাল, শক্তির অনন্ত আধার। কাল অর্থাৎ সময় তাঁর কাছে স্থির। গাঢ় ধূম্রবর্ণ তাঁর গাত্র। অথবা মসিবর্ণ। বা নীল। অসীম মহাশূন্য যেমন নীল। অন্ধকারাচ্ছন্ন। মুণ্ডমালাবিভূষিতা। করকঙ্কণ আভরণ। তাঁর কণ্ঠে ছেদিত অসুরদের মুণ্ডমালা এবং কর্ণে শিশু বা মৃতদেহের কুণ্ডল। শিবের উপর দণ্ডায়মানা, যা আপাত নিষ্ক্রিয় পরমাত্মা এবং সক্রিয় মহাশক্তির প্রতীক। শোণিতাভ লোলজিহ্বায় জিঘাংসা। রক্তাক্ত খড়্গ। অন্য হাতে নরমুণ্ড। বীভৎসতার আড়ালে গভীর ব্যঞ্জনাময়। সবই আসলে সৃষ্টি আর বিনাশের রহস্যময় চিরন্তন সত্য।

ছেলের দল বসে শোনে। চুপটি করে। তাদের মা-বাবারাও। অবাক বিস্ময়ে।

রামা খানিক কৌতূহলে জিজ্ঞেস করে, “তাহলে মা দুগ্গাই কালী বুঝি!”

আবার বেজে ওঠেন রথীনদাদু, “একই অঙ্গে কত রূপ।”

“দাদু, কালকে তো মা দুগ্গা ভাসান যাবেন। আটচালা তখন অন্ধকার। আবার ঝলমলিয়ে উঠবে কালীপুজোর দিন। তাই না?”

“ঠিকই তাই। নবমীর পর দশমী। মা যাত্রা করবেন কৈলাসের পথে। তারপর একাদশী, দ্বাদশী... পূর্ণিমাতে কোজাগরি লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা। তারপর পরের অমাবস্যায় কালীর আরাধনা।”

আটনে মায়ের জীবন্ত মূর্তি। মহাসপ্তমী, মহাষ্টমীর পুজো গ্রহণ করে মায়ের ত্রিনয়ন থেকে যেন ঝরে পড়ছে অনাবিল স্নেহাশিস। মুখে মধুর হাসি। ওই ভুবনমোহিনী রূপের ছটায় ম্লান হয়ে যায় মর্ত্যের সব সৌন্দর্য। সেই দিকেই তাকিয়ে ছিল রামার বাবা উমেশ। একদিকে মায়ের অপার রূপমাধুরী, অন্যদিকে রথীনকাকার অমৃতবাণী। মনটা হারিয়ে যায় অনেক আগের এক সকালে।

...তখন সে তার কন্যার বয়সি।

বাতাসে হিমেল স্পর্শ। মনটা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। কালীপুজো, ভাইফোঁটার পর পরই খুলে যাবে স্কুল। আবার লেখাপড়া। পরীক্ষা। তার মধ্যে আর-এক দফা উত্তেজনা।

আজ কালীপুজো। আটচালায় ছোটো একটু প্যান্ডেলে মা এসেছেন। মায়ের ইটের আসনটিকে রঙিন কাগজে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। সে দায়িত্ব পেয়েছে আঠা দিয়ে কাগজ সাঁটানোর। সামান্য দায়িত্বটুকু পেয়েই সে যেন উড়ছে। বন্ধুরা ঈর্ষার চোখে দেখছে তাকে।

মাইকে বাজছে শ্যামাসঙ্গীত।

তাদের পুজো হবে নিশিভোরে।

সারাদিন পুজোর জোগাড় করতে ব্যস্ত। কাউকে একটু সাহায্য করতে পারলে বুক চওড়া। একটু বেলপাতা ছিঁড়ে দেওয়া। জবাফুল তুলে আনা। এইসব।

নাওয়াখাওয়ার সময় নাই।

দুপুরে বাড়িতে পূর্বপুরুষদের প্রতি পিণ্ডপ্রদান হয়েছে। পাটকাঠির গোছা ঘিয়ে ডুবিয়ে আগুন ছুঁইয়ে রাখা হয়েছে।

সন্ধে নামতে-না-নামতেই সেই পাটকাঠির গোছায় আগুন জ্বালিয়ে ঘাটের মাথা, সারকুঁড়, নাছদরজা আর নিকটবর্তী বেগুনের খেতে সন্ধে দেখানো। স্বর্গে বাতি দেওয়া। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে আলো দেখানো। কেউ কেউ ফানুস তুলেছে আকাশে। রঙিন কাগজের মধ্যে প্রদীপের আলো জ্বলছে, রঙিন হয়ে। মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে। সারা পাড়ায় টিপটিপ মোমবাতির আলো জ্বলছে। ক্যালেন্ডারে আজকের দিনটিতে লেখা আছে, দীপাবলি।

বন্ধুরা মিলে বেরোনো হয়েছে অন্য পাড়ায় ঠাকুর দেখতে। সবার হাতে ‘স্পেশাল টর্চ’। এই টর্চের প্রযুক্তি এবং পেটেন্ট একেবারেই দেশীয়। নারকেলের মালার মাঝের ছিদ্রে গোঁজা একটি কাঠি। সেইটি টর্চের হাতল। মালাইয়ের মাঝখানে বসানো একটি মোমবাতি। অমাবস্যার রাতের গাঢ় অন্ধকারে গ্রামের পথে একদল চলেছে ওই বিশেষ আলো হাতে নিয়ে। আলাদা উত্তেজনা। একবার এদিক, একবার ওদিক। মাঝে দেখা অন্য পাড়ার দলের সঙ্গে। তাদের হাতেও ওই বিশেষ আলো।

কালীপুজোর রাতের কোথাও একটা আলাদা মাত্রা আছে। তরল কালো অন্ধকার, আলকাতরার মতো বেষ্টন করে রেখেছে চরাচর। কেমন একটা থমথমে ভাব। তারই মাঝে আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপে অন্ধকার রঙের মা শ্যামা। ডাকের সাদা সাজ, মাথার চূড়ায়। ভয়ংকরী মূর্তির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। লোলজিহ্বা যেন সৃষ্টিকে গ্রাস করে নিতে চায়। বরাভয়প্রদায়িনী হস্তের রক্তিম তালুতে রাখা বিশাল একটি কদমা। নীচের শিয়ালটি উন্মুখ হয়ে আছে। কাটা মুণ্ড থেকে নিঃসৃত শোণিত পানের আকাঙ্ক্ষায়। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাঁধের ধার থেকে ভেসে আসে হুক্কি হুয়া। তারাও কি ভাগ পাবে তাজা মনুষ্যশোণিতের? কোথাও কোনও আওয়াজ নাই। শুধু ভরাট গলায় মন্ত্রোচ্চারণ ভেসে আসে, “কালী কালী মহাকালী কালীকে পাপহারিণী, ধর্মার্থমোক্ষদে দেবী নারায়ণী নমোস্তুতে।” সদ্যস্নাত অজাগুলি কাঁপছে। গা থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে জল। মায়ের হাতের খড়্গ জিঘাংসায় উন্মত্ত। খড়্গ উত্তোলিত। মাঝে একটি লাল টিপ। লালচোখ কর্মকারমশাইয়ের। লাল সিঁদুর অজার শিংয়ে। সবই লাল। রক্তও তো লাল!

রাত গভীর হয়। কোথাও দূরে ডেকে ওঠে নিশাচর পাখি। থেমে গেছে মন্ত্রোচ্চারণ। ভয়ে ভয়ে মায়ের আঁচলের পাশে গুটিগুটি উমেশ। ভয়ার্ত মুখের পানে চায় মা। “ভয় কি রে খ্যাপা। এখনই বলি হবে। চুপটি করে থাকো, কেমন।”

মণ্ডপের মা-ও মনে হয় অভয় দেন, “ওরে, ভয় নাই।”

সবাই নেমে আসে হাঁড়িকাঠের চারপাশে। ঢুলি প্রস্তুত। কোশাকুশি নিয়ে নেমে আসেন ঠাকুরমশাই। মন্ত্রপূত হয় সবকিছু। পাশবিক একটা চাপা আর্তনাদ ফুটে ওঠে। উপরে ওঠে খড়্গ। নিমেষে চোখ বন্ধ করে ফেলে। পরক্ষণেই বাজনা শুরু হয়। উন্মত্ত বাদ্যে তখন ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছে অমানিশার তমসা।

চোখ খোলা যায় না।

চারদিক থেকে ঢাক, ঢোল, কাঁসির বাদ্য।

চোখ খুললেই আবার খড়্গ উঁচুতে ঝিলিক দেয়, জিঘাংসায়। চোখ বন্ধই থাকে। সম্মিলিত “মা মা” বলে গর্জন, আর সেই সঙ্গে বলির আওয়াজ।

কেমন যেন শীত শীত করে। ভোরের বাতাস লেগেছে বুঝি গায়ে।

কপালে এসে পড়ে ঈষদুষ্ণ চটচটে কিছুর ফোঁটা। শিউরে ওঠে। সর্বাঙ্গে যেন কাঁটা বিঁধে যায়। শীতে না ভয়ে!

ভীষণ ভয় লাগে।

সর্বাঙ্গে আড়ষ্টতা জড়িয়ে ধরে। কুঁচকে ওঠে কপাল। শিউরে ওঠে গা।

“বাবা বাবা, তুমি অমন করছ কেন? তুমি কি ভয় পেয়েছ? এই তো আমি।”

রামা জড়িয়ে ধরে বাবাকে। উমেশ আজ রামার বাবা। কচিখুকি মায়ের কাছে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে থাকে বুড়ো বাপ।

তখনও আলাপ বন্ধ হয়নি।

“আচ্ছা দাদু, কালীমায়ের মূর্তি এমন কেন?”

“তন্ত্রের দেশ ভারতবর্ষ। বৌদ্ধতান্ত্রিক। তারাতান্ত্রিক। এই তান্ত্রিকদের আরাধ্যা দেবী মা কালী। বাংলায় কালীসাধনা খুব প্রাচীন নয়। নবদ্বীপের কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ বর্তমান কালীপ্রতিমার প্রবর্তক। উচ্চকোটির তান্ত্রিক ছিলেন তিনি। তাঁর আরও একটি পরিচয় আছে। তিনি আমাদের রামপ্রসাদের গুরুদেব। সেই রামপ্রসাদ, যিনি জগজ্জননীকে দিয়ে বেড়ার সুতো পরিয়ে নিয়েছিলেন। স্বয়ং মা কালী কন্যার বেশে রামপ্রসাদকে বেড়ার দড়ি গলিয়ে দিয়েছিলেন। আবার অসামান্য সব সঙ্গীতের মাধুর্যে শ্যামা মাকে জয় করেছিলেন। ‘মন রে কৃষিকাজ জানো না’। সিদ্ধ সাধক রামপ্রসাদের তান্ত্রিক গুরু ছিলেন কৃষ্ণানন্দ।”

শুধু ছেলেপিলে নয়, তাদের মা-বাবারাও আসরে উপস্থিত। “তাহলে কি ধ্যানে ধরা দিলেন, শ্যামা মা, নিজের মূর্তিতে?”

বুড়ো রথীন ঘোষ হারিয়ে গেছেন অন্যলোকে। স্বগতোক্তির মতো বলে চলেন, “বাংলায় তখন বেশ অরাজকতা। শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত কৃষ্ণনামের মহিমা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার ঘরে ঘরে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ধর্মীয় ভাব থেকে বহু দূরে। ইংরেজ শাসকের অধীনে বাস করতে হয়। আগে তারাসাধকেরা শ্যামামায়ের আরাধনা করতেন পটচিত্র সামনে রেখে। কোনও সুনির্দিষ্ট মাতৃমূর্তি ছিল না। কৃষ্ণানন্দ বসলেন গভীর ধ্যানে। তিনি মায়ের কাছে তাঁর স্বরূপ জানতে চাইলেন। যে মূর্তির সামনে সাধারণ মানুষ সমর্পণ করবে নিজের সবটুকু। মাতৃআজ্ঞা পেলেন, অতি প্রত্যুষে প্রথম যে মূর্তি নয়নগোচর হবে, সেই মূর্তিতেই অধিষ্ঠান হবে মায়ের।”

“দাদু, কী দেখলেন আগমবাগীশমশাই সকালে?”

“দেখলেন, এক আদিবাসী রমণী গাছকোমর বেঁধে গাছে ঘুঁটে দিচ্ছে। বাম হাতে তার গোবরের তাল। লাবণ্যময়ী। ঘোর কৃষ্ণবর্ণা। ঠাকুরমশাইকে দেখামাত্র লজ্জায় জিভ কেটে পিছন ফিরে দাঁড়াল সেই মেয়ে। ডান পা আগে। দক্ষিণাকালী। সেই মূর্তিতেই শ্যামামায়ের আরাধনা শুরু হল বাংলাদেশে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র আরও প্রসার ঘটালেন। তারপর একে একে এলেন রামপ্রসাদ, রামকৃষ্ণ পরমহংস, বামা খ্যাপা। বাংলার মানুষ শ্যামামায়ের আরাধনায় ব্রতী হল। সুখে-দুঃখে, শোকে-আনন্দে তারা শরণ নিল শ্যামা মায়ের।”

আটচালায় ভর্তি মানুষ।

আজ আর কারওর মনে দুঃখ নাই। শ্যামা মা তাদের মনের কষ্ট লাঘব করেছেন। তাঁর আগমনবার্তা ভোরের শিশিরে, শিউলির বোঁটায়। ছেলেপুলেদের মনে আরও আনন্দ। মা দুর্গা আসতে যাবেন, ঠিকই। কিন্তু কয়েক দিন পরেই আসবেন অন্যরূপে।

করুণ মুখগুলি ঝলসে ওঠে আনন্দে।

কালীপুজো। আর ক’দিন বাদেই তো কালীপুজো। শ্যামা আরাধনা।

দুর্গাপুজো তো কম কম। অথচ প্রচুর কালীপুজো, এদিক-ওদিক। সকাল থেকেই সাজো সাজো। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঠাকুর।

মাইকে বাজবে পান্নালাল ভট্টাচার্যের শ্যামাসঙ্গীত। বাতাসে শীত শীত ভাব। ভোরের বাতাসে শিশিরের ছোঁয়া। ঘাসের ডগায় সেই ছোঁয়া, মুক্তোবিন্দু। চলতে গেলেই শিশিরে পা ভিজে যায়।

তখন শিউলিফুল বিছিয়ে, শিউলিতলায়: শ্যামামায়ের আগমনি আলপনায়।

সকলকে শুভ দীপাবলির শুভেচ্ছা, ভালোবাসা অন্তহীন।

 

মন্তব্যসমূহ