প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর

 

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান

 

তমোঘ্ন নস্কর

 

 

দ্বাদশ পর্ব: একলব্যা!

 

 

বাচ্চা দুটো ঝোলা থেকে বের করে আনল তাদের হাত। ভেবেছিলেন, ফুলের তোড়া কিন্তু বেরিয়ে এল দুটো বেঁটে বেলজিয়াম রিভলভার! তাদের চকচকে নল দুটো কালাচ সাপের ছোবলের মতোই উগরে দিল উপর্যুপুরি ছ’রাউন্ড বুলেট; ঘ্রুম ঘ্রুম ঘ্রুম

বিস্মিত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট ভাবছিলেন, এই মেয়ে দুটো পিস্তল চালাল! এই মেয়ে দুটো! এই কাঁপুনি, ব্যাক কিক সামলে গুলি চালাল পর পর! আর ও কী! ওই বাচ্চা মেয়েটা তর্জনী নয় মাঝের আঙুলে বন্দুক চালাচ্ছে এ কী তবে সত্যিই গডেস দুর্গা!

 

***

 

ডাইনিং টেবিলে প্রাতরাশ সারছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব। আরদালি এসে বললেন, দু’টি বাচ্চা মেয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চায়। তাদের কিছু আর্জি রয়েছে। বিরক্তিভরা প্রতিপ্রশ্ন এল, “বাচ্চা মানে?

“এই চোদ্দো-পনেরো বছরের হবে

বিরক্তমুখে উঠলেন ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্স। এই এক জ্বালা হয়েছে, নিজেরা স্বদেশি স্বদেশি করে প্রাণ ওষ্ঠাগত করে তুলেছে। আর তাদেরকে একটু সাজা দিলেই সমস্যা! বুড়ো বাপ-মাগুলো তো কোনও কাজের নয় ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলোকে সামনে এগিয়ে দিয়ে ক্ষমা চাওয়ায়। নিশ্চয়ই এদের কেউ গারদে আছে! গজগজ করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এলেন ম্যাজিস্ট্রেট। হ্যাঁ, নেহাতই দুটো বাচ্চা মেয়ে! স্কুলের পোশাক! তা হলে, কোনও অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ বোধহয়

ম্যাজিস্ট্রেট নিশ্চিন্ত নিঃশঙ্কচিত্তে তাদেরকে উপরে আসতে দিলেন। কেউ তাদেরকে সার্চ করল না। তাদের বুকের উপর স্কুলের ব্যাচ জ্বলজ্বল করছিল। আর তাছাড়া এতটুকু দুটো মেয়ের থেকে ভয়-ই বা কী? তারা তাঁকে একটি আবেদন পত্র দিল। তারা স্কুলের মধ্যে একটি সুইমিং পুল বা সাঁতারের স্থান চায়। যেহেতু ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবই সর্বেসর্বা। তাই তাঁর সই ছাড়া কোনও কিছু স্থাপনকর্ম করা সম্ভব নয়। তাই ফৈজুন্নিসা কলেজের প্রিন্সিপালের তরফ থেকে তারা আবেদন পত্রটি সই ও ফরোয়ার্ড করার নিমিত্ত নিয়ে এসেছে। ম্যাজিস্ট্রেট প্রসন্ন মুখে চিঠিটি নিয়ে গেলেন ভিতরে সই ও সিল মারার জন্য, ফিরে এলেন হাসিমুখে।

মেয়ে দু’টিকে সম্ভাষণ করার আগেই, বাচ্চা দুটো ঝোলা থেকে বের করে আনল তাদের হাত। ভেবেছিলেন, ফুলের তোড়া কিন্তু বেরিয়ে এল দুটো বেঁটে বেলজিয়াম রিভলভার! তাদের চকচকে নল দুটো কালাচ সাপের ছোবলের মতোই উগরে দিল উপর্যুপুরি ছ’রাউন্ড বুলেট; ঘ্রুম ঘ্রুম ঘ্রুম

বিস্ময়মাখা চোখে যন্ত্রণার অভিব্যক্তি নিয়ে চিরনিদ্রায় ঢলে পড়লেন কুমিল্লা সদরের ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস জিওফ্রে বাকল্যান্ড স্টিভেন্স! দিন ১৪ ডিসেম্বর, সাল ১৯৩১

 

***

 

দুই আসামিকে তাদের বয়সের কথা বিবেচনা করে আজীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হল।” কলম তুলে নিলেন জজ সাহেব। কান্নায় ভেঙে পড়লেন সেই দুই বালিকা। আজ দুমাস পর তাঁদের রায় দান। এই কদিনে অনেক যন্ত্রণা অনেক অত্যাচার তাঁরা মুখ বুজে সহ্য করেছে। বড়ো আশা করেছিলেন দু’জনে, কর্মের জন্য তাঁরা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। হাসিমুখে পরবেন ফাঁসির দড়ি। কিন্তু তার বদলে কারাদণ্ড! ভাবুন, তাঁরা কেবলই বালিকা; একজনের বয়স চোদ্দো, অপরজনের বয়স পনেরো!

 

***

 

শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

শান্তি ঘোষ ১৯১৬ সালের ২২ নভেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তদানীন্তন ছাত্রী সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদিকা ছিলেন।

ছাত্রী সংঘ ছিল নারীদের বিপ্লবী সংগঠন। শান্তি ঘোষ কুমিল্লার ফৈজুন্নেসা গার্লস স্কুল ও ছাত্রী প্রফুল্ল নন্দিনী ব্রহ্মর থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেইখান থেকেই পথ চলা এবং পরে যুগান্তর দলে যোগদান। যুগান্তর দল সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন। জুজুৎসু, কুস্তি, লাঠিখেলা, অস্ত্রচালনা-সহ আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ যুগান্তর তাঁকে দিল। মাত্র পনেরো বছর বয়সে নিজেই হয়ে উঠলেন একখানি অস্ত্র।

সুনীতি চৌধুরী ১৯১৭ সালের ২২ মে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শুরু থেকেই কুমিল্লাবাসী। মহান বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের কর্মকাণ্ডে প্রভাবিত হয়েছিলেন সুনীতি। এক্ষেত্রে বলে রাখা প্রয়োজন, ১৯২০ সালে আন্দামান থেকে আলিপুর বোমা মামলার অন্যতম বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তকে মানসিক চিকিৎসার জন্য বিহারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে এসে তিনি আবার সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। এবং ওই সময় অর্থাৎ ১৯৩০ সাল থেকে আবার দেড় বছরের জন্য জেল খেটেছেন। বালিকা সুনীতি মনে মনে উল্লাসকর দত্তকেই নিজের আদর্শ মানতেন।

এমন মেয়েদেরই তো প্রয়োজন ছিল দেশের কাজে। আবারও ফৈজুন্নিসা বিদ্যালয়ের প্রফুল্ল নন্দিনী ব্রহ্ম হলেন তাঁর দীক্ষাগুরু। তিনিই তাঁকে যুগান্তর দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি ‘মীরা দেবী’ ছদ্মনামে পরিচিত হলেন। মনে রাখা প্রয়োজন তখন তার বয়স মাত্রই চোদ্দো।

সুনীতির বয়সের কথা বিবেচনা করে তাকে ‘অস্ত্রভাণ্ডারের রক্ষক’ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ছাত্রী সংঘের নারী সদস্যদের লাঠি, তলোয়ার ও ছুরি চালনার প্রশিক্ষণ দিতেন সুনীতি।

কুমিল্লার (তদানীন্তন ত্রিপুরা) ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্স সাহেবের অত্যাচার দিন-কে-দিন বেড়েই চলছিল। চট্টগ্রামের ঘটনার পর অভিযুক্ত সকল বিপ্লবীদের হাতের নাগালে না পেয়ে একের পর এক সাধারণ মানুষকে ধরে এনে অকথ্য অত্যাচার চালাতেন। তাঁর সন্দেহ হলেই তিনি তাদেকে ধরে আনতেন। এবং দিনের পর দিন বন্দি করে কথা বের করার চেষ্টা করতেন। কার্যক্ষেত্রে দেখা যেত নিরীহ এবং এই বিষয়ে সম্পর্কহীন মানুষটা অত্যাচারিত হয়ে জোর করে দোষ স্বীকার করে জেলের ঘানি টানত!

অতএব শুরু হল নিধনের পরিকল্পনা। অবশ্য পরে সুনীতি দেবী তাঁর মেয়ের কাছে বলেছিলেন যে, এটা নিধন নয়। মা দুর্গা কখনও অসুরকে নিধন করেন না। এ হল সাময়িক স্থবির করে দেওয়া। যা ভীষণ প্রয়োজন ছিল। আসল অসুর তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য।

ছ’মাস ধরে একটু একটু করে নিজেদের তৈরি করেছিলেন তাঁরা, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছে পৌঁছোতে গেলে দু’জন বালিকারই প্রয়োজন ছিল। তা হলে নিরাপত্তার ঘেরাটোপ পেরিয়ে সরাসরি মুখোমুখি হওয়া যাবে তাঁর

সাঁতার ক্লাবের অনুমতির পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে সমাধান হল কিন্তু সব কিছুর পর দেখা গেল, মূল প্রতিবন্ধকতা লক্ষ্যভেদ নয়, তা এই দু’টি বালিকা ভালোই পারেন। কিন্তু সমস্যা রিভলভারের পিছনের ধাক্কা সামলানো। সুনীতির তর্জনী সঠিকভাবে ট্রিগারে পৌঁছোত না, কিন্তু তিনি হার মানতে রাজি ছিলেন না। ভারতবর্ষ খুঁজে আনা হল বেঁটে বেলজিয়াম রিভলভার।

সুনীতি একপ্রকার অসাধ্য সাধন করলেন, তর্জনী নয় মধ্যমা আঙুল দিয়ে ট্রিগার চালানোর অভ্যাস করলেন। নিজেরাই ভেবে দেখবেন, তর্জনীর জন্য সারাজীবনের জন্য অস্ত্র ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল একলব্য। অথচ এই বালিকা তর্জনী পরিত্যাগ করে মধ্যমা দিয়ে অস্ত্র চালানো অভ্যাস করলেন! কী সাংঘাতিক অধ্যবসায়!

 

***

 

দুই মেয়ে সেদিন পালাতে পারেননি। পালানোর অবস্থাও ছিল না। গ্রেফতারির পর শান্তি ঘোষকে রাখা হয়েছিল দ্বিতীয় শ্রেণির কারাগারে, অর্থাৎ যেখানে অন্যান্য নারী-বিপ্লবীরা ছিলেন। কিন্তু কনিষ্ঠ সুনীতিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণির কয়েদখানায়— চোর, ছিনতাইবাজ ও পকেটমারদের ভিড়ে। অমানবিক পরিস্থিতি— নিকৃষ্ট মানের খাবার, জীর্ণ বস্ত্র, অত্যাচার দিয়ে ভেঙে ফেলত চাইল তারা। অথচ সুনীতি স্থির রইলেন। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই চালিয়ে গেলেন তাঁর সশ্রম কারাজীবনের নিত্যকর্ম। তাঁকে নিয়মিত শোনানো হত পুলিশের বর্বরতার কথা; মা-বাবার উপর নির্যাতনের কথা, বড়োভাইয়ের গ্রেফতারি ও হয়রানির কথা। খেতে না পেয়ে ছোটোভাইয়ের পড়াশোনা ছেড়ে রাস্তায় হকার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এই সব খবর তাঁর অটল সংকল্পকে টলাতে পারেনি।

১৯৩৯ সালে, মহাত্মা গান্ধী ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে এমিনেস্টি ট্রিটি বা শর্তহীন ক্ষমা চুক্তির ফলে সাত বছরের সাজা ভোগের পর তাঁরা দু’জন মুক্তি পান।

মুক্তির পর সুনীতি ফিরে এলেন বটে। কিন্তু ততদিনে জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। তা সেই ছোটোভাইটি মারা গিয়েছেন। কলকাতায় কোনও থাকার জায়গাও নেই। আর-এক প্রখ্যাত মহিলা বিপ্লবী বীণা দাসের দিদি কল্যাণী দাস তিলজলায় একটি আশ্রয়স্থল চালাতেন। সেইখানে তিনি আশ্রয় নিলেন। ভর্তি হলেন আশুতোষ কলেজে। তিলজলা থেকে রোজ হেঁটে আশুতোষ কলেজ যেতেন।

তারপর পরীক্ষা, নীলরতন সরকার কলেজে ভর্তি এবং সফলতা। যদিও সফলতা খুব একটা সোজা ছিল না। তবুও তিনি এম.বি (অধুনা এম.বি.বি.এস) ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি তাঁর বিজ্ঞান-শিক্ষক প্রদ্যোতকুমার ঘোষকে বিয়ে করেন। তাঁকে বহুবার রাজনীতিতে আসার অনুরোধ করা হলেও তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেননি। বরং একজন চিকিৎসা হিসেবে সেবাকার্যে ব্রতী হতেই চেয়েছিলেন। সেইভাবেই তিনি তাঁর বাকি জীবন অতিবাহিত করেন।

অন্যদিকে, শান্তি ঘোষ ভর্তি হন বেঙ্গলি উইমেনস কলেজে এবং ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেন। পরবর্তীতে জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। শান্তি দেবী দুই টার্ম পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন; ১৯৫২-’৬২ এবং ১৯৬৭-’৬৮ সাল।

১৯৬২-’৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতেও বিধায়কের দায়িত্ব পালন করেন। অরুণ বহ্নি শান্তি ঘোষের লেখা অন্যতম বিখ্যাত বই।

 

আমরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেছি এ সকল ইতিহাস। কিংবা আমাদের ইতিহাস এই মহান আত্মত্যাগগুলিকে বুড়ি-ছোঁয়া করে গেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এঁরা ছিলেন বলেই আমরা আছি। আমরা টিকে থাকব, লড়ে যাব কারণ, আমরা এই মায়েদের সন্তান।

জয় হিন্দ


______________________________________________________________________________

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:

প্রথম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html

দ্বিতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html

তৃতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html

চতুর্থ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

পঞ্চম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

ষষ্ঠ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html 

সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html

অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html

নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html

 

মন্তব্যসমূহ