প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর

 

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান

 

তমোঘ্ন নস্কর

 

 

ত্রয়োদশ পর্ব: মুষল-ধরা চুড়ি-পরা হাত

 

ডান দিক, বাম দিক; যেদিকে চোখ যায় একই দৃশ্য, থেঁতলে যাওয়া মৃতদেহের সারি— ভয়ে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কাহালে, এই কি তার স্ত্রী!

ঢেঁকির মুষল হাতে ফুঁসছেন তাঁর স্ত্রী। তাঁর হাতের চুড়ি, সোনার বালা তুবড়ে গেছে তরবারির আঘাতে। তবুও আঘাত করে চলেছেন, নির্দিষ্ট নিরবচ্ছিন্ন ছন্দে যেন ভর হয়েছে মারিআম্মানের, তাঁর কাছে যেতেই ভয় করছে এখন।

অবশ্য সুযোগ পেলেন না, গর্ত দিয়ে মুখ বাড়িয়েছেন আর-একটি বীরপুঙ্গব। দক্ষিণ তোরণের বিপদ ঘণ্টাটা বাজিয়ে তরোয়াল হাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কাহালে; যে-করে হোক এদের আটকাতেই হবে।

সেদিন এক অসম্ভব লড়াই লড়েছিলেন কাহালে আর তাঁর স্ত্রী! এমন লড়াইয়ের নজির সম্ভবত ইতিহাসে আর একটিও নেই। একটি শীর্ণপথের দায়িত্ব নিয়ে তথাকথিত অস্ত্র ছাড়া স্বামী-স্ত্রী লড়াই করেছিলেন এবং থামিয়ে দিয়েছিলেন প্রায় একটি গোটা রেজিমেন্টকে।

আসুন, একটু পিছনে হেঁটে, সেই মহান দম্পতির প্রেক্ষাপট জানি।

 

***

 

রাজা মাদাকারি নায়াকা, কেল্লাশহর চিত্রদুর্গের অধিপতি। ১৭৭২— দক্ষিণ ভারতে এ এক পালাবদলের সময়। মারাঠাদের অষ্টম পেশোয়া মারা গেছেন। পেশোয়া মাধবরাও-কে যাঁরা যাঁরা সাহায্য করেছেন, তাঁদেরকে খুঁজে খুঁজে ধ্বংস করছেন তীব্র আগ্রাসী হায়দার আলি।

হায়দার আলি আর পুত্র টিপু সুলতান, একের পর এক দখল করছেন মারাঠা রাজ্যগুলি। নারী-শিশু কাউকে ছাড়েন না। মাদাকারি প্রাথমিক পর্যায়ে হায়দার আলিদের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন নিজের পিঠ বাঁচানোর জন্য। কিন্তু এক পর্যায়ে তাঁদের বর্বরতা কাঁপিয়ে দিল মাদাকারিকে।

বিরোধিতা করেছিলেন। ক্রুদ্ধ ও প্রতিশোধস্পৃহী হায়দার আলি ঠিক করেছিলেন চিত্রদুর্গও দখল করবেন কিন্তু চিত্রদুর্গ দখল করা বড়ো সোজা কথা নয়।

চিত্রদুর্গ কেবলমাত্র ঐতিহাসিক নয়, এক মহাকাব্যিক শহর। চিত্রদুর্গের আসল নাম হল কোটেদুর্গ অর্থাৎ পাথরের শহর। সত্যিই তা-ই, পাথর, খাড়া-পাহাড় ও কাঁটা-জঙ্গলের কারণে চিত্রদুর্গ ছিল দুর্গম।

চিত্রদুর্গ হিড়িম্ব, হিড়িম্বা আর ঘটোৎকচের চরণভূমি। অবশ্য এই কিংবদন্তি কথার প্রমাণ ইতিহাস আবার দিয়েছিল।

বারবার আক্রমণ করে ব্যর্থ হয়ে হায়দার আলি যখন শেষবারের জন্য আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছেন, এ ঘটনা সেই দিনের। সেদিন জন্ম হয়েছিল এক নারী-বীরের!

 

***

 

গঠন

 

চিত্রদুর্গের কেল্লাটি সুপ্রাচীন। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরভাবে গঠিত কেল্লাটি কালে কালে সংস্কার হয়ে প্রলম্বিত ও বর্ধিত হয়েছে। এবং একটি আস্ত কেল্লা নগরীতে পরিণত হয়েছিল। নগরীর মধ্যস্থলের উচ্চতম প্রান্তে রাজার বাস। চতুর্দিকে জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র হাতায় রক্ষী-প্রহরীরা একরকম নিজ নিজ সংসার সমেত বসবাস করতেন।

বিভিন্ন কৌণিক অবস্থানে ও কেল্লা-প্রাকারে অজস্র ঘণ্টা ছিল জরুরি অবস্থা সম্বন্ধে সূচিত করার জন্য। তেমনই একটি অবস্থানে থাকতেন রক্ষী কাহালে। কাহালেরা কর্ণাট প্রদেশের সুপ্রাচীন অধিবাসী। কৃষিজীবী হোলায়ার সম্প্রদায়। প্রায় পনেরো বছর রক্ষীর কাজ করছিলেন দক্ষিণের নিভৃততম একটি কৌণিক প্রাকারবিন্দুতে।

 

***

 

ঘটনা

 

দুপুরে খেয়েদেয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন রক্ষী কাহালে। স্ত্রী ওবাভভা গিয়েছিলেন বাসনকোসনগুলি ধুতে। কেল্লার গায়েই তাঁদের ছোট্ট ঠাঁই। একটু আগেই সবকিছু ভালোভাবে দেখে দেখে এসেছেন। খাড়া পাহাড়ের নীচে ধু-ধু করছে প্রান্তর। কাঁটাঝোপ দুপুরের রোদে নেতিয়ে আছে। কাহালের এই দিকের অবস্থানটি বেশ সুরক্ষিত। একেবারে খাড়া পাহাড়। পাহাড় বেয়ে উঠলেও তার উপর দুই মানুষ উঁচু পাঁচিল বা প্রাকার। তাতে লোহা-গুটি, এত সহজে এদিক দিয়ে আসা যাবে না। ঘুমও এসে গিয়েছিল বোধহয়। আচমকা এই একটা দুশ্চিন্তা হল তাঁর।

অনেকক্ষণ হয়ে গেল, এখনও ওবাভভা ফেরে না কেন? বিপদ হল নাকি? জলধারের পাথরটার স্যাঁতলা হয়েছে। পা পিছলে গেল নাকি। দুশ্চিন্তা নিয়ে এগিয়ে গেলেন কাহালে।

 

***

 

অন্যদিকে

 

জল তুলে ফিরে আসছিলেন স্ত্রী ওবাভভা। সড়সড় আওয়াজে একটু অনুসন্ধিৎসু হয়ে, এদিক-ওদিক তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। কেল্লার পাঁচিলের ছোট্ট ইঁদুর-গর্তটা খুঁড়ে বড়ো করে ফেলেছে কিছু লোক। সেখান দিয়ে একজন-একজন করে ঢুকে পড়ছে, নিঃশব্দে টিকটিকির মতো বুকে হেঁটে। চেহারায় সুলতানের সৈন্যদের পোশাক।

পাথরের আড়াল থেকে লক্ষ করতে লাগলেন ওবাভভা। তিনজন মানুষ ঢুকেছে। তারা গর্ত খোঁড়া শুরু করেছে। অতি দ্রুত এই গর্তটা বড়ো হয়ে যাবে। তখন আর একজন নয়, একসঙ্গে দু’জন তারপর তিনজন। তারপর পিলপিল করে ঢুকে পড়বে তাদের বাহিনী। নিশ্চয়ই পাহাড়ের গায়ে গা মিলিয়ে অপেক্ষা রয়েছে শতাধিক ঘাতক।

সজাগ করার জন্য ঘণ্টা অবধি যেতে হবে। কিন্তু এখান থেকে যেতে যত সময় লাগবে, ততক্ষণে আরও অন্তত বিশজন ঢুকে পড়বে। তখন তাদের সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। আর ভাবলেন না ওভাভবা।

ঢেঁকি থেকে খুলে নামিয়ে আনলেন মুষলটা। দেরি দেখে নিশ্চয়ই আসবেন তাঁর স্বামী। তিনিই খবর দেবেন বাকি বাহিনীকে। আর ভাগ্য ভালো থাকলে তাঁদের অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনে, কেউ না কেউ নিশ্চয়ই আসবে। ততক্ষণে আটকে রাখতে হবে এদের, যে-করেই হোক।

শুরু হয় এক অসম যুদ্ধ। একদিকে মুষল বা ওনাকে হাতে এক সাধারণ পুরনারী। অন্যদিকে হায়দার আলির সুশিক্ষিত সেনাবাহিনী।

 

***

 

আচমাই পিছন থেকে ভারী আঘাতে ছিটকে পড়ল তিনজন সৈন্য। ধাক্কার অভিঘাত সামলে নিজেদের প্রস্তুত করতে করতে, মুষলের ভারী ঘা এসে গুঁড়িয়ে দিল মাথা।

দু’জন সৈন্য তরবারি হাতে সে-নারীর মুখোমুখি দাঁড়ালেন বটে, নারীও যেন সাক্ষাৎ রণচণ্ডী! অভ্যস্ত হাত ঘোরাচ্ছেন ভারী লম্বা দণ্ডটা। সৈন্যদের তরবারি-বর্শা ওবাভভাকে স্পর্শ করার আগেই, তারা ছিটকে পড়ছে আঘাতে।

তারা ভেবেছিল সামান্য অন্দরনারী। এঁর আর কতটুকু-ই বা যুঝবার ক্ষমতা। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, গৃহশ্রম করা নারী শক্তিতে একজন পুরুষের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। সত্যিই তা-ই; ধান সেদ্ধ, ধান ঝাড়া, ধান কোটা, মশলা পেষাই, এইগুলিকে অন্দরকর্ম ভেবে নিই আমরা। কিন্তু আদতে এগুলো এক ধরনের কসরত।

ততক্ষণে আরও বেশ কয়েকজন ঢুকে পড়েছে ভিতরে। মাথা তুলতে গিয়ে অবাক হয়ে তারা আবিষ্কার করল, ঢুকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক নারীর মুষলের ভারী আঘাতে ছিটকে যাচ্ছে তারা। এইভাবেই চলতে লাগল সেই যুদ্ধ।

যে-ই মাথা গলিয়ে ভিতরে ঢুকতে চায়, মুষলের ঘায়ে তার মাথা গুঁড়িয়ে দেন ওবাভভা। তাঁর স্বামী যতক্ষণে এলেন ততক্ষণে প্রায় ত্রিশজনকে ধরাশায়ী করেছেন তিনি।

এখন সৈন্যরা ঘিরে ধরে ওবাভভাকে আঘাত করছেন। পেরেও উঠছেন না তিনি। একসঙ্গে দু’-তিনজন করে উঠে আসছে। ফলে, গর্ত আর-একটু বড়ো হয়ে গেছে। একসঙ্গে দু’জন করে উঠে আসছে সেই গর্ত গলে।

কাহালে বুঝতে পারেননি যে, এমন কিছু ঘটেছে। এখন তিনি দেখলেন, যদি ঘণ্টার দিকে ছুটে যান, তা হলে সেই সুযোগে আরও কিছু সৈন্য উঠে আসবে। যুদ্ধক্ষেত্র অনিশ্চয়। যে-কোনও মুহূর্তে যে-কোনও আঘাতে তাঁর স্ত্রী ভূমি নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে এই সময় তাঁকে সাহায্য করাটাই বেশি প্রয়োজন। যেমন ভাবনা তেমন কর্ম।

কাহালে-ওবাভভা, দু’জনে মিলে আটকে রেখেছিলেন হায়দার আলির সেনাদের। প্রায় তিনটি ঘণ্টা ঠেকিয়ে রাখেন তাদের। যতক্ষণে রাজা-সৈন্য এসেছে, ততক্ষণে তাঁদের চতুর্পাশে জমা হয়েছে মৃতদেহের স্তূপ।

ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে এলিয়ে পড়েন। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় তাঁর। না মৃত্যু নয়, যুদ্ধক্ষেত্রেই বীরগতি প্রাপ্ত হন ওবাভভা দেবী। কয়েকদিন পর তাঁর স্বামী। পিছু হঠতে বাধ্য হয় হায়দার আলির সৈন্যরা।

না, সেদিন চিত্রদুর্গ কেল্লা দখল করতে পারেনি। তার কারণ কিন্তু মাদাকারির আগত সৈন্যদের ভয় নয়, কেবল এই দুই নর-নারীর প্রতিরোধে শেষ হয়ে গিয়েছিল হায়দারের আগ্রাসী বাহিনীর দুই-তৃতীয়াংশ। ভেস্তে গিয়েছিল হায়দার বাহিনির পরিকল্পনা।

কিন্তু সেই গর্তটি এখনও আছে। বীর বীরের সম্মান করে। অনেক পরে চিত্রদুর্গ দখলের পর হায়দার আলি সেই মহীয়সীকে স্মরণ করে ওই গর্তের নাম দিয়েছিলেন ‘Onake Obavvana kindi’; কিন্দি অর্থাৎ গর্ত।

আজ আমরা কত কথা বলি। কিন্তু সত্যি কথা, যিনি প্রসবযন্ত্রণা, ঋতুচক্র সহ্য করেন, সেই নারী এত ঠুনকো নন। সেদিন এক গৃহবধূ কোনও অস্ত্র নয়, নেহাতই ঘর-গেরস্থালির নিত্য প্রয়োজনীয় এক উপাদান আর উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে আটকে দিয়েছিলেন গোটা একটা বাহিনী। নিজের আশেপাশে দেখবেন, বুঝবেন এটা সত্যি

ইতিহাসের পাতার আড়ালে এরকম অজস্র বীরের কথা লেখা আছে। ইতিহাস যখন একতরফা হয়, বড়ো সমস্যা হয় জাতির আগামীর জন্য। তাই যাঁদের কথা আমরা ভুলেছি, তাঁদের স্মরণ করানোর জন্য এই প্রয়াস।


______________________________________________________________________________

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:

প্রথম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html

দ্বিতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html

তৃতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html

চতুর্থ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

পঞ্চম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

ষষ্ঠ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html 

সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html

অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html

নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html

দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html

 

মন্তব্যসমূহ