প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর

 



প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান

 

তমোঘ্ন নস্কর

 

 

চতুর্দশ পর্ব: নাইকি দেবী

 

রক্তে মাখামাখি হয়ে তাঁবুতে প্রবেশ করলেন মহম্মদ ঘোরি। তাঁর ধাতব শিরস্ত্রাণে লেগে আছে শুকনো প্রদেশের রুক্ষ ধুলো। তাঁদের সবুজ পতাকার বর্ণ চেনা যায় না।

বড়ো কঠিন সংগ্রাম হয়েছে আজ। সোজা পথে না এসে, বাঁকা পথে নেমে এসে যুদ্ধ করা বড়ো কঠিন ছিল। কিন্তু তাও উপরওয়ালার কৃপায় জয়ী হয়েছেন তিনি। এবারে বাজপাখির মতো ডানা মেলে নেমে যাওয়া যাবে ভারতবর্ষের উপর। ঠিক এই কারণেই এত পরিশ্রম। গজনীর সুলতানদের এড়িয়ে গিয়ে সাবধানে সন্তর্পনে ভারতবর্ষে প্রবেশের পথ খুঁজছিলেন তিনি।

আশা করা যায়, খাইবার এবং বোলানে তানায়েত গজনী সৈন্যরা এটুকু বুঝেছে, তিনি তাদের আক্রমণ করতে চান না। তিনি যখন ভারতবর্ষ আক্রমণ করবেন, তারা নিশ্চয়ই পিছন থেকে তাঁকে আঘাত করবে না। তাদের মকসদ তো এক ও অভিন্ন; জিহাদ তথা সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ।

ঘুরিদ-এর সিংহাসনে ধর্মপ্রাণ দুই ভাই রাজত্ব করত একত্রে। বড়োভাই গিয়াদের দায়িত্ব ছিল ঘুরিদ থেকে পশ্চিম প্রান্তের যতদূর অবধি সম্ভব ইসলামকে সম্প্রসারিত করা। অপরদিকে ছোটোভাই মহম্মদ ঘোরির দায়িত্ব ছিল পূর্বদিকে নিজের রাজত্বের সম্প্রসারণ। সুদূর পশ্চিমের ঘুরিদের রাজধানীতে দাঁড়িয়ে পূর্ব দিকের সবচাইতে সমৃদ্ধশালী ও সম্পদময় দেশ বলতে সিন্ধু অববাহিকায় ভারতবর্ষ। সেখানে সোমেশের (শিব) নামে ঘণ্টাধ্বনি হয় প্রতিদিন। সেই স্বর্ণঘণ্টার গম্ভীর নাদ এসে ধাক্কা মারে মহম্মদ ঘোরির কানে। ঘোরি লালায়িত হন ওই স্বর্ণদেশ জয় করার আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু সেই স্বর্ণদেশের মানুষজন, তারা কি দুর্বল নাকি?

 

***

 

পাটনের প্রাসাদে অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন এক নারী। তাঁর পিছে পিছে হাঁটছে এক শিশু  মায়ের এমন ক্রোধের কারণ কী, শিশুটি তা বুঝতে পারে না। অবাক কৌতূহলে মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে নাড়া দেয়। মায়ের কোলে উঠতে চায়। কিন্তু মা আজকে যেন বড়োই আনমনা। তার কথায় সাড়া দেয় না।

অবশেষে তিনি ছেলেকে কোলে তুললেন। শিশু দারুণ আনন্দে খিলখিল করে হেসে ওঠে। তোয়াক্কা করেন না মা। বজ্রকঠিন কণ্ঠে দূতকে আদেশ দেন, “জালোরের চৌহান আর আবুগিরির পার্মারদের সন্দেশ পাঠান। বলুন, অজয়পালের বিধবা রানি নাইকি তাঁর সন্তান মুলারাজার হয়ে, অখণ্ড ভারতবর্ষের দ্বারপাল হিসেবে তাদের সাহায্য প্রার্থনা করছেন। ভীষণ আগ্রাসী শক্তিকে ভারতবর্ষের দরজা থেকে বিদায় করতে গেলে এই তিন শক্তির সম্মিলিত হওয়া প্রয়োজন।”

 

***

 

এরকম ভয়ানক যুদ্ধ মহম্মদ ঘোরি স্বপ্নেও কল্পনা করেননি।

নাদলের ধ্বংসের পর মন্থরগতিতে এসে পৌঁছেছিলেন আবুগিরি অর্থাৎ বর্তমান মাউন্ট আবু পাদতলে। মনে প্রবল বিশ্বাস, নাদলের চৌহানকে যখন তিনি পরাস্ত করতে পেরেছেন, তখন বাকি যুদ্ধটাও তিনি অনায়াসেই জিতে নেবেন। যতদূর চোখ যায় শুধু নিজের সৈন্যদের ছাউনি আর সবুজ রঙে রঞ্জিত পতাকা। আবুগিরির অপর পারে যারা আছে তারা আর কতটুকু হবে! তার উপর শুনেছেন মুলারাজা নেহাতই শিশু। রাজ্য চালনা করেন এক নারী। নারী আর কী করবেন? নারীর নেতৃত্বে কোনও রাজাই এগিয়ে আসবেন না! এ কথা বলাই বাহুল্য।

 

***

 

নিশীথের অন্ধকারে আকাশে চাঁদের আলো যেন রক্তে রঞ্জিত— এমনই এক রাত, যখন ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা হল এক গ্রেট এসকেপের কাহিনি। আফগান বীর মহম্মদ ঘোরি রক্তাক্ত অবস্থায় ভীরু খরগোশের মতো পালাচ্ছেন।

 

***

 

পিঠে সন্তানকে বেঁধে ঘোড়ায় চড়ে সেনাবাহিনীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে চলেছেন নাইকি দেবী। তাঁর কণ্ঠে আওয়াজ আজকে সপ্তম সুর ছুঁয়েছে, আমি রাজা অজয়পালের বিধবা, যুবরাজ মুলারাজার মা। তোমাদের সবার মা। এই যুদ্ধ শুধু রাজ্য রক্ষার নয়, এটি সম্মান, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের লড়াই। আজ যদি আমরা মরিও, তবে এমনভাবে মরব যাতে শত্রুর হৃদয়ে চিরকাল ভয় গেঁথে থাকে। দ্যাখো, সেই জন্যই শিশু মুলাকেও আমি আমার পিঠে বেঁধে রণক্ষেত্রে নিয়ে এসেছি, যাতে তোমাদের কখনও মনে না হয় যে, তোমাদের রাজা তোমাদের সঙ্গে নেই। তোমাদের ভবিষ্যৎ রাজা তার চোখ দিয়ে প্রত্যক্ষ করবে, তার রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কতখানি রক্তের দাম দিতে হয়েছে তার প্রজাদের, সে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে, তার মাটির প্রতি, তার মানুষের প্রতি  জয় সোমেশ

রব উঠল, “জয় সোমেশ জয় সোমেশ।”

সুবিশাল হস্তীবাহিনী কী বুঝল কে জানে! এতগুলি মানুষের সম্মিলিত রবে তারাও যেন পাগল হয়ে গেল। ওঁউউউউউউ শব্দে ভীষণ বৃংহণ তুলে মাটি কাঁপাল।

ঘোরির সেনাবাহিনী বিশাল। প্রশিক্ষিত, এবং রক্তপিপাসু তুর্কি যোদ্ধা তারা। মরুভূমির ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে আসা মানুষগুলোর যুদ্ধই পেশা। বাঁকানো আকৃতির তরবারি নিয়ে ছোটো ছোটো দ্রুতগামী অশ্বে চড়ে তারা আসে। এবং ধ্বংস করে দিয়ে চলে যায়। ক্ষিপ্রতাই তাদের মূল অস্ত্র। ক্ষিপ্রতার জন্যই তারা যে-কোনও ব্যূহ অতি সহজে ভেদ করতে পারে।

 

***

 

সূর্যোদয়ের ঠিক আগে চতুর্দিক সচকিত হল তীব্র-গলায়, বাদ্যে ও ঘং বাঁশির শব্দে। ঘোরির সেনারা তির বর্ষণ শুরু করল। বেঁটে বেঁটে অজস্র তির, আকাশ বিদীর্ণ হয়ে গেল যেন।

নাইকি দেবীর সৈন্যরা অপেক্ষা করল। কারণ, ভারতবর্ষের ভোরের বাতাস বিশেষত বর্ষার সময়ে বড়ো ওলটপালট হয়; কখনও পূর্ব দিকে ছাঁট আসে তো, কখনও দক্ষিণ দিকে। যেমন ভাবা তেমনই হল। তির সে-লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছোতে পারল, কয়েকজন হতাহত হল বটে কিন্তু বেশিরভাগ তির ছড়িয়ে গেল এদিক-ওদিক।

এই কারণেই রানি নাইকি তিরের ব্যবস্থা বিশেষ করেননি। বড়ো শলাকা তির তাঁদের, রৌদ্র উঠলে তারপরেই তিনি তাদের ব্যবহার করবেন, তখন বাতাস ভারী হবে। ভারী পাথর বর্ষণই এখন উপযুক্ত। ঘড় ঘড় শব্দে ভারী ভারী পাথর ফেলতে লাগলেন সৈন্যদলের একেবারে মাঝখানে।

এইবার সমস্যায় পড়ল তুর্কিরা। এতক্ষণ তারা ছোটো ছোটো রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে এসেছে। পাথর বর্ষণের যন্ত্র তাদের সঙ্গে থাকলেও সেগুলো অপেক্ষাকৃতভাবে ছোটো। সেই সুদূর ঘোর থেকে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তাদের অধিকাংশ বড়ো পাথরপ্রক্ষেপণ যন্ত্রই নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

এখানে তিনটি রাজ্যের পতাকা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ রানি তিনটি শক্তিকে যে একত্রিত করেছেন, তা তারা আশা করেনি।

তারা এখন যে অংশটিতে রয়েছে, এটি হল আবুগিরির একটি গিরিপথ। এর মধ্যে দিয়ে তাদের পাথর অত দূরে গিয়ে পৌঁছোবে না। একসঙ্গে চতুর্দিক থেকে ছড়িয়ে পড়ে ইগল-ডানা বিস্তার করে আক্রমণও করতে পারছে না। গিরিপথের বাইরে এলেই পাথরে পিষে যাবে।

 উপরন্তু সম্মুখে এক অদ্ভুত প্রাণীকে দেখা যাচ্ছে! সেই পর্বতপ্রমাণ প্রাণীটির চোখটুকু ছাড়া আর সর্বশরীর তার বর্মে ঢাকা। তাতে লাগানো ধারালো কিল। এই প্রাণীটি যদি ঘোড়ার মতো হয়, তা হলে দ্রুত গতিতে ছুটলে তারা তো এমনিতেই পিষে যাবে।

যুদ্ধ চলল। তুর্কিরক্তে রঞ্জিত হল ভূমি। সৈন্যদের চিৎকার, ঘোড়ার হ্রেষা, তরবারির ঝলক— কিন্তু এসবের মধ্যেও স্থির চিত্রার্পিতের ন্যায় দাঁড়িয়েছিল সেই ভীমকায় প্রাণীগুলো।

আশ্চর্য হয়ে মোহাম্মদ ঘোরি দেখছিলেন রানি নাইকিকে, এতদিন জেনে এসেছেন, নারীরা দুর্বল হয়, তারা কোমল হৃদয়ের ও কোমল ত্বকের অধিকারী কিন্তু এ মেয়ে যেন সিংহী। পিঠে সন্তান বেঁধে যুদ্ধ করছেন। চোখগুলো আগুন বর্ষণ করছে যেন।

মহম্মদ ঘোরির অন্যতম সেনাপতি গারজভি রেজা মহড়া নিল রানির। এক সামান্য নারীর হাতে রেজার মতো তুখোড় যোদ্ধাও ভূমি নিল! নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না ঘোরির। আগুন ধরে গিয়েছিল সর্বশরীরে। সর্বস্ব পণ করে যুদ্ধের মঞ্চে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি।

মহম্মদ ঘোরির রণনীতি নিঃসন্দেহে নিপুণ। ক্রমশ চাপে পড়তে লাগল সম্মিলিত বাহিনী।

সম্মুখভাগে থাকা নাইকি দেবীর সেনারা একে একে পতিত হচ্ছিল। কেউ পিছু হটেনি কিন্তু ঘোরির বাহিনী ক্রমশই ঠেলে দিচ্ছিল তাদের।

ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসের হাসিটা আবার ফিরে আসছিল মহম্মদ ঘোরির মুখে। ঠিক সেই সময়ে আমূল পরিবর্তন করল যুদ্ধক্ষেত্রে। সমস্ত সৈন্যরা এক পাশে সরে গেল। আর শুরু হল ভীষণ ঢাকের বাদ্যি। পর্বতের ন্যায় বিশাল সেই প্রাণীগুলো এতক্ষণ শিকল দিয়ে বাঁধা ছিল। তাদের পায়ের শিকল খুলে দিতেই সবাই পাগলের মতো ছুটে পালিয়ে গেল। সেই পর্বতে এসে আছড়ে পড়ল তুর্কিবাহিনীর উপর। ছোটো ছোটো ঘোড়ায় চড়া তুর্কিবাহিনী পিষে যেতে লাগল সে-আক্রমণে।

মহম্মদ ঘোরি এই প্রথম জানলেন এই প্রাণীর নাম! এই প্রাণী হস্তী। শুঁড়ে পেচিয়ে আছড়ে দুমড়ে-মুচড়ে একশা করে দিল মস্ত তুর্কিবাহিনীকে।

তিনি বুঝতে পারছেন, তিনি ফাঁদে পড়েছিলেন, নাইকি দেবী তাঁকে গিরিপথের ভিতর থেকে টেনে এনেছেন সম্মুখভাগে। এইবার তিন দিক থেকে আসছে আক্রমণ। উন্মুক্ত প্রান্তরে এনে ফেলাটাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। হস্তীরা যেমন এসেছিল তেমন পিছনে চলে গেছে, কিন্তু এখন ত্রিফলা আক্রমণ। ওই যে জালোরের চৌহান, আবুগিরির পার্মার আর ও কে!

মহম্মদ ঘোরি দেখলেন, পতপত করে উড়ছে নাদলের চৌহান বংশের পতাকা। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কলহনদেব। শুনেছিলেন, এই রাজা নাকি নিহত হয়েছেন। তবে কি নাদলের পরাজয়ও একখানি ফাঁদ ছিল?

তিনি বুঝলেন, তাঁরা শুধু সৈন্যদের সঙ্গে নয়, এক অদম্য আত্মার সঙ্গে যুদ্ধ করছে।

কলহনদেব তীব্র প্রতিশোধস্পৃহায় আঘাতে আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করলেন সব। মহম্মদ ঘোরি রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় কোনওরকমে প্রাণটুকু বাঁচিয়ে সিন্ধু উপত্যকা ধরে পলায়ন করলেন।

সেইখানে সেই প্রান্তে বিশাল বড়ো এক তোরণ রচনা করলেন কলহনদেব। সেই স্বর্ণতোরণে অধিষ্ঠিত করলেন তাঁর সোমেশ্বরকে। তাঁর সোমেশ্বরকে কলুষিত করেছিল ওই যবন। আজ ওই তোরণশীর্ষে বসে তাঁকে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত উপহাস করবেন সোমেশ্বর।

 

ইতিহাসের পাতায় ১১৭৮-এর সেই ভীষণ সংগ্রাম ‘কায়দারা যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। ‘কায়দারা যুদ্ধ’ স্মরণ করে রানি নাইকি ও তাঁর সহযোগী তিন রাজাকে, যাঁরা কয়েক বছরের জন্য এক তীব্র আগ্রাসী শক্তির ঝড়ের হাত থেকে ভারতভূমিকে রক্ষা করেছিলেন। পালন করেছিলেন দ্বারপালের কর্তব্য। এই সকল বীরেদের স্মরণ করা উত্তরাধিকারী হিসাবে আমাদের কর্তব্য।


______________________________________________________________________________

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:

প্রথম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html

দ্বিতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html

তৃতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html

চতুর্থ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

পঞ্চম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

ষষ্ঠ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html 

সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html

অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html

নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html

দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html

ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html

 

মন্তব্যসমূহ