প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর

 

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান

 

তমোঘ্ন নস্কর

 

 

একত্রিংশ পর্ব: লাচিত

 

দেখতে দেখতে রাগে লাল হয়ে গেল মুখখানা। মুহূর্তে কোষ থেকে অসি উন্মুক্ত করলেন তিনি। চক্ষের নিমেষে ঘটে গেল ঘটনাটা। থরথর করে কেঁপে উঠল সমবেত শ্রমিক এবং রক্ষীগণ। তাদের উল্টোদিকে যে-মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, সেই মানুষটার দিকে তারা তাকাতেও ভয় পাচ্ছে। কিন্তু যদি তাকিয়ে দেখত, তা হলে দেখতে পেত তার চোখের জলে ক্রোধের আগুন নির্বাপিত হয়েছে।

 

***

 

ঘোড়া ছুটিয়ে নিজের ঘরের দুয়ারে এসে থামলেন তিনি। হাউমাউ করে ছুটে এলেন তাঁর মা। আঁচড়ে, কামড়ে থাপ্পড় মেরে লুটিয়ে পড়লেন ছেলের বুকে। মায়ের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে সেই ছেলে বিড়বিড় করে চললেন, “দেশতকৈ মোমাই ডাঙর নহয়।” অর্থাৎ জন্মভূমি থেকে মামার স্থান বড়ো না।

 

***

 

শীতের সকাল, ১৬৭১ সালের মার্চ মাস।

এইদিকে শান্ত নিরিবিলি শীতের সকাল হয়। গ্রামের সকাল যেমন হয় আর-কি। মানুষজন কাঁধে কোদাল নিয়ে মাঠের দিকে যায়। ব্যবসায়ীরা ছোটো ছোটো ছাও নৌকায় চেপে চলে নগরে বাণিজ্য করতে।

আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। ব্রহ্মপুত্রে দারুণ ঢেউ, তার তীরে হাজার হাজার চুলায় ধোঁয়া উঠছে, যেন নদীটা শ্বাস নিচ্ছে। এক লক্ষ মানুষের রান্না হচ্ছে সেখানে।

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি, রাম সিংহ পঞ্চাশ হাজার যোদ্ধা— সতেরো হাজার কাবুলি অশ্বারোহী, বিশ হাজার তিরন্দাজ, আর হাজার কামান নিয়ে ঘাঁটি গেড়েছেন। এ তাদেরই প্রাতরাশের বন্দোবস্ত।

পুরো দলটা এসে পৌঁছোয়নি। এলেই আক্রমণ করবেন। ততদিন এটাই তাঁদের ঘাঁটি।

আহোম রাজ্যের এই ছোট্ট জমি, অসমের এই সবুজ উপত্যকা পায়ের তলায় পিষে ফেলতে চায় বুঝি তারা। এই পবিত্র নদী, ব্রহ্মপুত্র, যার পথের ধারে সরাই থাকে যাত্রীদের জন্য। সেখানে আজ অনাহুত অতিথিরা এসে ঘাঁটি গেড়েছে। তাদের চক্রান্তে সেটি আজ যুদ্ধক্ষেত্র।

 

প্রেক্ষাপট: অসমে (আহোম) মোগল অভিযানের উত্থানপতন

 

১৬০২ সালে ঢাকার নবাব পশ্চিম অসমের ধুবরীর (অধুনা ধুবড়ি) রাজা পরীক্ষিত নারায়ণকে আক্রমণ করেন। এতদিন পূর্বাঞ্চলের এই অঞ্চলটি মোগলদের চোখে পড়েনি। এই আক্রমণ মোগলদের মধ্যে অসমে সাম্রাজ্য বিস্তারের আগ্রহ জাগায়।

১৬১৫ সালে আহোম রাজা প্রতাপ সিংহের রাজত্বে মোগলরা অসমে প্রথম আঘাত হানল। সুদীর্ঘ যুদ্ধ-বিগ্রহের পর ১৬৩৯ সালে অসুরর আলি সন্ধিতে এই দীর্ঘ বিবাদ শেষ হয় এবং সীমানা নির্ধারণ করা হয়।

১৬৪১ সালে কোচ রাজা পাণ্ডু মোগল হস্তে পরাজিত হলে গুয়াহাটি ও হাজো মোগলের অধীনে আসে।

১৬৫৮ সালে শাহজাহানের মৃত্যুর পরবর্তীকালে ভাতৃদ্বন্দ্বের সুযোগে কোচবিহারের রাজা প্রাণনারায়ণ হাজো দখলের চেষ্টা করেন, কিন্তু আহোম রাজা জয়ধ্বজ সিংহ তাঁকে পরাজিত করে গুয়াহাটি ও হাজো দখল করেন। আওরঙ্গজেবের ক্ষমতায় আসার পর ১৬৬০ সালে মির জুমলা বাংলার সুবেদার হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৬৬১ সালে অসম আক্রমণ করেন। তিনি গুয়াহাটি ও রাজধানী গড়গাঁও দখল করলেও মন্ত্রী অতন বুঢ়াগোহাঁইয়ের গেরিলা যুদ্ধ এবং বর্ষার কারণে মোগল সেনা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জয়ধ্বজ সিংহ শান্তির প্রস্তাব দেন, ফলে ১৬৬৩ সালে ঘিলাঝারিঘাট সন্ধি হয়— গড়গাঁও আহোমের কাছে ফিরে আসে। এভাবে মোগলের অসম-অভিযানের প্রথম পর্ব শেষ হয়, আহোমের স্থিতিস্থাপকতায়।

 

চক্রধ্বজের উত্থান ও গুয়াহাটি পুনরুদ্ধার

 

মির জুমলার পরাজয়ের পরপরই জয়ধ্বজ সিংহের মৃত্যু ঘটে, এবং চক্রধ্বজ সিংহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি আহোম সাম্রাজ্যকে পুনর্গঠিত করেন— ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, খাদ্যসংগ্রহ, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং নতুন দুর্গ নির্মাণের মাধ্যমে। লচিত বরফুকনের নেতৃত্বে অজেয় সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। প্রতিবেশী জয়ন্তিয়া ও কাছাড়ির সঙ্গে মৈত্রী বন্ধন গড়েন। ঘিলাঝারিঘাট সন্ধির শর্ত তিরস্কার করে তিনি মোগলদের কর দেওয়া বন্ধ করেন।

১৬৬৭ সালে গুয়াহাটির মোগল সুবেদার ফিরোজ খাঁ বিদ্রোহ দমন করতে উদ্যোগ নেন। তখন যুবক লচিত ও অতন বুঢ়াগোহাঁ‌ই একত্রিত হয়ে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নেন।

 

গুয়াহাটি পুনরুদ্ধার

 

আহোম সেনা প্রথমে কলিয়াবরে দুর্গ স্থাপন করে এগিয়ে যায়। অসমের ভারী বর্ষায় মোগল বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, সেই সময় লাচিত বাহবারি দখল করেন। তারপর আগষ্ট–সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্ষার সুযোগ নিয়ে জল-স্থলপথে কপিলি থেকে গুয়াহাটির মধ্যবর্তী কাজলি, সোনাপুর, পানিখেতি ও তিরামারি করায়ত্ত করে ফেলেন।

উত্তরে কানাইবরশিবোয়া, হিল্লার, হিন্দুরিঘোপা, পাটদুয়ার করাই; দক্ষিণে লতাশিল, জয়দুয়ার, ধরমদুয়ার, দুয়ারগুড়িয়া, পাণ্ডু আক্রান্ত হয়। একপ্রকার অনায়াসেই সেগুলো দখল হয়। আসলে এই উত্তর পূর্বাঞ্চলের বর্ষার সঙ্গে এতদিন অব্দি মোগল বাহিনী পরিচিত ছিল না। এই ভীষণ বর্ষাতে তারা কিছুতেই সুবিধা করতে পারছিল না। বঙ্গদেশের বর্ষার সঙ্গে এই বর্ষার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা বর্ষার জলে পুষ্ট নদী-নালা এবং ঝরনাগুলি অতর্কিতে বাহিনীর রসদ ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায়। সঠিক অবস্থান বুঝতে না পেরে বারবার বিপর্যস্ত হতে থাকল তারা। কেবল প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়েই অর্ধেক যুদ্ধ জয় করে নিয়েছিল লচিতের বাহিনী।

আহোম নৌসেনা উমানন্দ, বরহাট দখল করে গুয়াহাটি পুনরুদ্ধার সমাপ্ত করে সুবেদার ফিরোজ খাঁকে বন্দি করে মানাহমুখ পর্যন্ত রাজত্ব বিস্তার করে।

কিছুদিন পর রাম সিংহ বিশাল মোগল সেনা নিয়ে আক্রমণ করে গুয়াহাটি পুনরুদ্ধার করেন, তবে অন্যান্য অঞ্চল আহোমের নিয়ন্ত্রণে থাকে। সরাইঘাটের যুদ্ধের বীজ বোনা হয়।

 

মোগলের রাজকীয় অভিযান

 

 ১৬৬৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর আওরঙ্গজেবের কাছে পরাজয়ের খবর পৌঁছোয়। তৎক্ষণাৎ তিনি রাম সিংহকে আদেশ দেন অসম জয়ের। রাম সিংহ পটনার সুবেদার টেগ বাহাদুর ও বঙ্গদেশ রশিদ খাঁর সহায়তা প্রাপ্ত হন, তৎক্ষণাৎ ৩০,০০০ সৈন্য, ১৫,০০০ ধনুর্বিদ, ১৮,০০০ ঘোড়া, ১,০০০-এর বেশি কামান ও বিশাল নৌবহর নিয়ে প্রস্তুত হন— মোগলদের যুদ্ধযাত্রার অর্থই হল অকুণ্ঠ রাজকীয় অভিযান। ব্রহ্মপুত্রের পাড় কম্পিত হয় ভীষণ পদশব্দে।

 

***

 

আবার যুদ্ধের দিন

 

ব্রহ্মপুত্রর অপর পাড়ে স্থির দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন লাচিত। বহু যুদ্ধ দেখেছেন তিনি কিন্তু আজকে তাঁর বিপরীতে যে-বাহিনী দাঁড়িয়ে আছে সেই বাহিনীর সরাসরি সম্মুখীন হওয়ার ক্ষমতা তাঁদের নেই। তিনি একটা জিনিস জানেন— ‘প্রাণ দিতে জানলেই কেবল যুদ্ধ হয় না। প্রাণ নিতে জানতে হয়। এবং জিততে জানতে হয়। যুদ্ধ না জিতলে অহেতুক আত্মত্যাগ বোকামি।’ মনে মনে পন্থা ঠিক করলেন তিনি।

আহোমের ছোট্ট সেনা মোগলের লক্ষ চক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে গড়ল এক আশ্চর্য ইতিহাস।

গুয়াহাটির অসমতল জমিতে মোগলের ঘোড়া আটকাতে বিশাল দেওয়াল বানানোর কাজ শুরু করল তারা। ওদিকে মোগলরা অপেক্ষা করছে।

মামাকে দায়িত্ব দিলেন লাচিত— কিন্তু সময় মতো দেওয়াল উঠছে না। দেশের থেকে মামা বড়ো নয়। নিজ হস্তে মামার শিরশ্ছেদ করলেন লাচিত! ভীত-ত্রস্ত সেনারা এবার দলে দলে যোগ দিল। রাত জেগে দেওয়াল পূর্ণ হল— পাথর-কাঠ-মাটির অটল প্রাচীর। মোগলের স্থলপথ বন্ধ হল!

নৌ যুদ্ধের জন্য বাংলা থেকে মোগলরা ঘুরাব প্রভৃতি জলযান নিয়েছিল, কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের মতো পাহাড়ি নদীর স্রোতে বড়ো বড়ো ভারী নৌকা খুব একটা কাজে এল না। আহোম বাহিনী তাদের লোহার হালকা হাঙর-নৌকায় আক্রমণ শুরু করল। বারংবার আক্রমণ আসতে লাগল। গেরিলা আঘাতে ছিন্নভিন্ন হল মোগলরা।

 

রাম সিংহ প্রথম ধাক্কায় পরাজিত হলেন। ততদিনে সরাইঘাটে পরিপূর্ণ মোগল বাহিনী এসে উপস্থিত হয়েছে। ঝড়ের মতো এগিয়ে এল ৩০,০০০ সৈন্য, ১৫,০০০ ধনুর্বিদ, ১৮,০০০ ঘোড়া, ১,০০০ কামান, বিশাল নৌবহর!

আহোম সৈন্যরা ভয়ে পিছু হটল। তাদের চাগিয়ে গেলেন একা লাচিত, “তোমরা যদি পিছিয়ে যেতে চাও, যাও, কিন্তু স্বর্গদেও আমাকে আদেশ করেছেন, আমি মৃত্যুর আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ব, তোমরা স্বর্গদেওকে বলবে— আমি জীবনের অন্তিম নিশ্বাস পর্যন্ত যুদ্ধ করেছি।”

এক এক করে ফিরে এলেন তারা। এইবার মুষ্টিমেয় আহোম সৈন্যের ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন প্রকৃতি স্বয়ং। ঝড়ে নৌকা ভাঙল। বৃষ্টিতে গোলাবারুদ ভিজল। মোগল কামান থেমে গেল। এইবার চতুর্দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহোম সৈন্যরা, সাকুল্যে পাঁচ হাজার। কিন্তু এই কয়েক হাজারের আক্রমণেই রাম সিংহ পলায়ন করলেন। আর ফিরে আসেনি মোগল বাহিনী। এই যুদ্ধটি আহোম ও মোগলের অন্তিম যুদ্ধ ছিল। আহোম সাম্রাজ্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত অসম আহোম সাম্রাজ্যের অধীন ছিল।

আজও সেই স্থলে তাঁর বাণী বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিলাখণ্ড।


___________________________________________________________________________


প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:

প্রথম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html

দ্বিতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html

তৃতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html

চতুর্থ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

পঞ্চম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

ষষ্ঠ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html 

সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html

অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html

নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html

দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html

ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html

চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html

পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html

ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html

সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html

অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html

ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html

বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html

একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html 

দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html

ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html

চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html

পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html

ষট্‌বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html

সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html

অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html

ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html

ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html

 

 

 

মন্তব্যসমূহ