প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর

 

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান

 

তমোঘ্ন নস্কর

 

 

ঊনত্রিংশ পর্ব: বিদ্যাধর চান্দেলা

 

বিন্ধ্যাচলের প্রবল ধুলোর ঝড়ের মধ্যে চোখ খোলাই দায়। অথচ প্রাসাদের শীর্ষে চোয়াল কঠিন করে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। তিনি আজও ভুলতে পারেন না তাঁর পাঁচশত রণহস্তী হারানোর যন্ত্রণা। তারা তাঁর নিজের সন্তানের মতো ছিল। কিন্তু তবুও তাদেরকে হারাতে হয়েছিল যুদ্ধের কৌশলের জন্য। নিজের দেশকে বাঁচানোর জন্য কতগুলো নিরীহ প্রাণকে সুলতানের হাতে তুলে দিতে হয়েছিল কাপুরুষের মতো। আজকে সময় এসেছে, সেই প্রতিশোধ তিনি কড়ায় গন্ডায় উশুল করে নেবেন।

যখনই কাবুলশাহির রাজা ত্রিলোচনপালের পতন শুনেছিলেন তখনই বুঝেছিলেন— চার বছর পর সে আবার ফিরে এসেছে। নীচ থেকে তাতার সৈন্যদের আর্তনাদ ভেসে আসছে। আবার সেই দিকে মন দিলেন তিনি। সৈন্যদের পাথর ছোড়া বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন।

তিনি জানতেন, দুপুরের এই সময়টা ধুলোর ঝড় ওঠে। আকাশ থেকে রক্তাভ মেঘ নেমে এসে দৃষ্টি আড়াল করে। এই সময়টা বিন্ধ্যপর্বতের মাথায় কেন মধ্যদেশ অবধি ওঠাও দুষ্কর।

 

কালিঞ্জর দুর্গের অবস্থান নিয়ে একটু চোখ বোলানো যাক। প্রথম কয়েক মিটার ভীষণ মসৃণ এবং খুব সহজে চড়া যায় এমন ভাব বিশিষ্ট। এরপর মধ্য অঞ্চলটি খাড়া এবং মসৃণ। এই অঞ্চলটি চড়া এক প্রকার অসম্ভব। এই অংশটি অতিক্রম করে তারপর এই উপরের অংশ। তার উপর চ্যাটালো স্থানে অবস্থান করছে কালিঞ্জর দুর্গ। অবস্থানগত এই দুর্গমতার কারণেই কালিঞ্জর দুর্গ সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই বর্তমান। গুপ্ত যুগেও এর উল্লেখ পাই আমরা।

ভারতবর্ষের মধ্যাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন দুর্গগুলির মধ্যে কালিঞ্জর অন্যতম সম্ভবত গোয়ালিয়ার-এর আগে থেকেই এই দুর্গের অস্তিত্ব ছিল। চান্দেলা বংশের সিংহাসনে বিদ্যাধর রাজা হয়ে বসার পর নিজের দুর্গগুলিকে সুরক্ষিত করতে নজর দিয়েছিলেন। কারণ তিনি যখন সিংহাসনে বসছেন তখন বহিঃশত্রু ভারতবর্ষের দিকে বারবার আক্রমণ করছে।

বিদ্যাধর চান্দেলা মোটামুটি ১০০৪-১০৩৫ সন অবধি জেজাভুক্তি রাজা হিসেবে রাজত্ব করে গেছেন। কিন্তু ভাগ্যের এমন পরিহাস, প্রখ্যাত ঐতিহাসিকরা রাজত্ব ১০১৮-তে দেখিয়ে গিয়েছেন। ফলে স্বয়ং মামুদের বিরুদ্ধে তার এত বড়ো একখানি প্রতিরোধ ১৯৭০ অব্দি প্রায় ঢাকাই পড়ে রইল। ১৯৭০ সালে বিন্ধ্যাচলের কুন্দেশ্বর থেকে একটি তাম্র লিপি উদ্ধার করা হয় যা স্বয়ং বিদ্যাধরের রানি সত্য খামা-র এবং সেই তাম্রলিপি প্রমাণ করে তাঁর রাজত্ব সুদীর্ঘ ৩১ বছরের। যে ৩১ বছরে তিনি দুই-দুইবার সুলতান মাহমুদকে প্রতিহত করেছেন। একবার বুদ্ধিমত্তায় এবং একবার বলে।

 

***

 

আবার রণপ্রান্তর (১০২৩)

 

মাহমুদ গজনি অস্থির পদচারণা করছিলেন তাঁর শিবিরে। এই রাজা তাঁকে একবার ধোঁকা দিয়েছে কিন্তু দ্বিতীয়বার তাঁকে পরাজিত না করলে তিনি মাহমুদ নন। শুধু তাই নয়, এই রাজা তাঁর আশ্রিত প্রতিহার রাজাকে হত্যা করেছে। কাপুরুষ বলে তাঁকে হত্যা করে সবার সামনে মাহমুদকেই অপমান করেছে সে।

মাহমুদ আবার রণকৌশল নিয়ে বসলেন। ডেকে পাঠালেন নিজের সেনাপতিদের। এইবারে তাঁর সঙ্গে বিশাল সেনা— ত্রিশ হাজার ঘোড়সওয়ার এবং চল্লিশ হাজার পদাতিক। কাবুল শাহি থেকে হাতিদেরকে নিয়ে আসেননি। এই দুর্গে চলার জন্য হাতিদের খুব একটা কাজেও লাগবে না। কেবল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বহন করার জন্য অল্প কিছু হস্তী তিনি রেখেছেন। তাদেরকে দিয়ে কীভাবে যুদ্ধ জয় করা যায় সেই পরিকল্পনাতে ব্যস্ত হলেন তিনি।

 

দুর্গের অবস্থান এমন ছিল চড়াই একেবারেই করতে হবে। মধ্যবর্তী কোন স্থানে থাকা এক প্রকার অসম্ভব। তিন দিনের চেষ্টায় রাত্রি থেকে আরোহণ শুরু করে কোনওমতে দুর্গের পাদদেশে এসে পৌঁছোলেন তাঁরা, কিন্তু উত্তপ্ত তেল আর প্রস্ত-বৃষ্টি সেখানে দাঁড়িয়ে অবরোধের সুযোগ দিল না।

তবে এই প্রচেষ্টা অনেকখানি সাহস দিয়েছিল মাহমুদের সৈন্যদের। তারা ছোটো-ছোটো সেনাদল নিয়ে বারবার বারংবার আক্রমণ করতে লাগল দুর্গের প্রাকার। বাইরে থেকে অর্থাৎ পর্বতের পাদদেশ থেকে ঘিরে রাখল সম্পূর্ণ দুর্গটিকে। একসময় না একসময় রসদ কমবে।

কিন্তু বিন্ধ্যপর্বত আদতে অজস্র পর্বতের সমষ্টি এবং তাকে সম্পূর্ণরূপে ঘিরে ফেলা সম্ভাব্য নয়। বিন্ধ্যারণ্যকে ঘিরে ফেলতে হলে কোটি সৈন্যও কম পড়বে। ফলে যা হবার তাই হল। দুর্গ অবরোধ করে সতৃষ্ণ নয়নে ফলের আশায় বসে রইলেন মাহমুদ গজনি। আর অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর খুলে যেত দুর্গ। বিদ্যাধরের বিশ্বস্ত সেনাপতিরা গ্রাম থেকে সরবরাহ নিয়ে ফিরতেন রসদ। দুর্গ আগলে বসে রইলেন সুলতান মামুদ।

 

১০১৯, ৪ বছর আগে

 

ঠিক চার বছর আগে জেজাভুক্তির উপর প্রথম আঘাত ছাড়া হেরেছিলেন সুলতান মাহমুদ। অন্যান্য দেশীয় রাজাদের মতো বিদ্যাধরকেও তাঁর বার্তা পাঠিয়েছিলেন দূত-মাধ্যমে— ‘ইসলাম গ্রহণ করো। মাহমুদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে, কর বজায় রেখে রাজত্ব করো।’

রাজা বিদ্যাধর ঘৃণা ঘরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সেই পত্র। তারপর সুবিশাল সৈন্যবাহিনী সাজিয়ে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন সুলতান মাহমুদের দিকে।

নদীর ধারে বিদ্যমান দুই পক্ষের শিবির পড়ল। অন্ধকার হওয়ার পর বিদ্যাধরের সুবিশাল বাহিনী এসে পৌঁছোল। সকাল হলে নদী পেরিয়ে শুরু হবে আক্রমণ। সারারাত তীক্ষ্ণ নজরে রাখলেন মাহমুদের বাহিনী। সকালে উঠেই নদী পেরিয়ে আক্রমণ চালাল। মাহমুদের দুর্ধর্ষ তাতার বাহিনী বারেবারে বিস্মিত হচ্ছিল। রাত্রে যেমন আয়োজন দেখেছে, সেই তুলনায় সৈন্যসংখ্যা যেন অনেক কম।

অল্প কিছু সৈন্য তাদেরকে বারবার বাধা দেয়ার চেষ্টা করছে।

সেই অল্প সৈন্যদেরকে নির্মূল করে পাশের জঙ্গল থেকে ৫৮০টি রনহস্তীকে করায়ত্ত করে খুশিমনে যুদ্ধজয়ের আনন্দ নিয়ে তারা ফিরে চলল। ভুলেও জানতে পারল না কী দারুণ কুটনৈতিক চাল চাললেন রাজা বিদ্যাধর।

কিন্তু সুলতান মাহমুদ বুঝেছিলেন যে, এর মধ্যে কিছু গন্ডগোল রয়েছে। তাই চার বছর পর আবার ফিরে এসেছিলেন।

 

১০২৩, বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্র

 

নীচ থেকে ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করে গেছে মাহমুদের ক্ষেপণযন্ত্রগুলো। কিন্তু দুর্গের তিনস্তরীয় দুর্গ প্রাকারের বাইরেরটাই সেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বিন্ধ্যারণ্য এত ঘন যে ক্ষেপণাস্ত্রের প্রাথমিক গতি ব্যহত হয় গাছের ডালপালায়। সেটা ভালোভাবে প্রাকারের কাছে পৌঁছানোর আগেই গড়িয়ে যায়। এ দিকে বর্ষা নামছে।

ভারতবর্ষের মধ্য-অঞ্চলে বর্ষার প্রকোপ প্রবল। তাতার বাহিনী শীত গ্রীষ্ম সহ্য করতে পারে, রুক্ষ পরিবেশ সহ্য করতে পারে। কিন্তু এই ভীষণ বর্ষা তারা সহ্য করবে কী করে?

 

অবশেষে শান্তির বার্তা আসে। সেই বার্তার সঙ্গে সুদীর্ঘ প্রশস্তিপত্র। সুলতান মাহমুদের দ্বারা অধিকৃত ১৫টি দুর্গ ফিরিয়ে দেওয়া হবে রাজা বিদ্যাধরকে, পরিবর্তে তার দেশে যে জিনিসটি নেই সেইটাই চান তিনি— তিনশত হস্তী।

কারণ মাহমুদের সৈন্যবাহিনীর মনোবল বলে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তার উপর ভারী বর্ষণ এবং দীর্ঘদিনের উপবাস তাদেরকে দুর্বল করে দিয়েছিল। তাই তাঁর শিবির বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য হস্তীর প্রয়োজন ছিল।

এবং মাহমুদ জেজাভুক্তি থেকে সরাসরি গজনির দিকে রওনা হন এবং এইটাই ছিল মাহমুদের শেষ ভারত আক্রমণ। বহু ঐতিহাসিক বলেন যে, রাজা বিদ্যাধর নিজে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু এস কে মিত্রর প্রশ্নটা ভীষণ সোজা ছিল। যদি তাই হয়ে থাকে, তা হলে তিনি ভারতবর্ষে আর ফিরলেন না কেন? এরপরেও তো সাত বছর তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন।


___________________________________________________________________________


প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:

প্রথম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html

দ্বিতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html

তৃতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html

চতুর্থ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

পঞ্চম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

ষষ্ঠ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html 

সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html

অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html

নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html

দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html

ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html

চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html

পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html

ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html

সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html

অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html

ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html

বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html

একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html 

দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html

ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html

চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html

পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html

ষট্‌বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html

সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html

অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html

 

 

মন্তব্যসমূহ