প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর

 

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান

 

তমোঘ্ন নস্কর

 

 

ত্রয়ত্রিংশ পর্ব: মাদুরাই

 

ভাইগাই নদীর জল লাল হয়ে রয়েছে রক্তে। তাতে এসে মিশেছে অস্তমিত সূর্যের লালিমা। তীরে মুষ্টিমেয় যোদ্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কুমার।

উল্টোদিকে ভীম-চেহারার দশাসই আফগানরা অট্টহাস্য করে উঠল— এই সামান্য কয়েকজন যোদ্ধা তাদের কী করবে! সহসাই মেঘে ঢেকে গেল চরাচর। আর সেই বজ্রগর্ভ মেঘের ভিতর হতে মুহুমুর্হু বজ্রপাত হতে লাগল সেই বজ্রপাতের মধ্যেই আফগান যোদ্ধারা হতবাক হয়ে দেখল মুষ্টিমেয় বিজয়নগর যোদ্ধা আর তাদের দলপতি যেন অপার্থিব কয়েকটি চরিত্র!

দলপতি কুমা কাম্পানার চূড়ায় বাঁধা চুল খুলে গিয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে লটপট করছে তাঁর উন্মুক্ত কেশভার। এলোচুল আড়াল করেছে তাঁর মুখাবয়ব, তাঁর হাতে সুবিশাল খড়্গ! এত বড়ো খড়্গ কি কোনও মানুষের হয়! পিছনের সেই যোদ্ধারা, তারাও যেন কোন অপার্থিব লোকের বাসিন্দা! পাথরের মতো স্থির নিশ্চল মানুষগুলো হাতে তরবারি নয়, বেরিয়ে এসেছে চাবুকের মতো হিলহিলে ইস্পাতের সর্প!

আক্রমণের নির্দেশ দেওয়ার পূর্বেই সম্মুখে থাকা আফগান দলপতির মাথাটি গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। সভয়ে তাকিয়ে দেখল সেই ইস্পাতের সর্প এতখানি দূরত্ব অতিক্রম করে ছোবল মেরেছে। এমন ধারা তরবারি তো তারা আগে দেখেনি!

তাদের মনে পড়ল মন্দিরের সেই দেয়াল চিত্রের কথা— হিন্দুদের এক দেবতা যাঁর জটায় বাঁধা চুল, তিনি তাঁর প্রেতবাহিনী নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করছেন। তারা উপহাস করে ছেনির ঘায়ে সেইসব ভেঙে টুকরো-টুকরো করে দিয়েছিল। কিন্তু মন্দিরের পুরোহিত তাদের বলেছিলেন, দেবতা অমর, তিনি ফিরে আসবেন। তাহলে কি তিনিই ফিরে এলেন!

তারপর সে এক ভীষণ যুদ্ধ। চিন্তাভাবনার অবকাশ আফগান সৈন্যরা বিশেষ পেল না। ডাইনে-বামে বাহিনীর মধ্যভাগে বিজয়নগরের বীরেরা ছড়িয়ে পড়ল বীরবিক্রমে। তছনছ করে দিল সুলতানের সুবিশাল বাহিনীকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আবিষ্কার করল, তাদের সুলতান আলাউদ্দিনের মাথাটি যুদ্ধক্ষেত্রের একেবারে মধ্যিখানে পতাকা দণ্ডের মাথায় গাঁথা। অস্ত্র খসে পড়ল আফগান প্রতিরোধের হাত থেকে

ভাইগাই নদীর জল শুদ্ধ হল পাপীর রক্ত পানে...

 

মধুরা বিজয়

 

কুমার কাম্পানার জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয় দাক্ষিণাত্য। কিন্তু রানি অবাক হন না। তুলি-কলম টেনে নেন। তাঁকে যে এই মহান গাথা লিখে রেখে যেতে হবে।

কুমারের পত্নী রানি গঙ্গা দেবী বীর মহীয়সী নারী। তিনি স্বামীর সঙ্গে প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতেন। কাঞ্চি দেবী মা ললিতা স্বয়ং যুদ্ধ দেবী। ইক্ষু দণ্ডের ধনুক হস্তে তিনি লক্ষ-নিযুত অসুরকে পায়ে দলন করেছেন। নারীর পর্দানশিন হওয়ার কথা নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে স্বামীর শক্তি হওয়াই আবশ্যক।

তাই, কুমারের সঙ্গে প্রতিটা যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি যেতেন। সেইভাবেই যুদ্ধের আগের রাত্রে এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি... কাঞ্চিপুরম যুদ্ধের আগের দিন গভীর রাত্রে ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন কুমার। সন্তর্পণে তাঁর পিছু নিয়েছিলেন রানি। কুমার এসে দাঁড়িয়েছিলেন কাঞ্চিপুরমের মন্দির প্রাঙ্গণে। আকুল হয়ে প্রার্থনা জানাতে-জানাতে আছাড় খেয়ে পড়েছিলেন মন্দিরের দুয়ারে।

তখনই বেরিয়ে এসেছিল সেই উজ্জ্বল জ্যোতিপুঞ্জ। ধীরে ধীরে সেই জ্যোতি এক মায়ের রূপ নেয়, অপরূপ তাঁর অবয়ব— যেন সাক্ষাৎ জগজ্জননী আপন তেজোময়ী বিভা নিয়ে এসে অবতীর্ণ হয়েছেন ভূমিতে! চোখ ধাঁধিয়ে যায় গঙ্গার... মায়ের হস্তে ভীমকায় এক খড়্গ। সেই খড়্গটি জানু পেতে বসে থাকা তাঁর স্বামীর মস্তকে ছুঁয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করে, তাঁর হস্তে দান করলেন মা ললিতাআম্বা। তিনি তখনই বুঝেছিলেন এই যুদ্ধে তাঁর স্বামীকে হারায় কার সাধ্যি! স্বয়ং পরাশক্তির শিব খড়্গ যাঁর হস্তে তাঁকে হারাবে সামান্য যবন!

রানি গঙ্গা দেবী লিখিত মধুরা বিজয়ে ধরা রইল এই আশ্চর্য কথন।

 

 

প্রেক্ষাপট

 

 সে এক অস্থির সময়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে আলাউদ্দিন খলজিসেনাপতি মালিক কাফুরের অশ্বক্ষুরের শব্দে কেঁপে উঠছে দাক্ষিণাত্যের মাটি। হোয়সল, যাদব আর পাণ্ড্য রাজবংশগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। চারদিকে হাহাকার, মন্দির চত্বরে তখন শঙ্খধ্বনির বদলে শোনা যাচ্ছে বিজয়ী সেনার হুংকার।

            ঠিক সেই অন্ধকার সময়ে তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে আবির্ভূত হলেন দুই ভাই— হরিহর ও বুক্ক রায়।

            কথিত আছে, তাঁরা ছিলেন কাম্পিলি রাজ্যের কোষাধ্যক্ষ। সুলতানি ফৌজের হাতে বন্দি হয়ে তাঁদের দিল্লিতে আনীত হন।

পরিস্থিতির চাপে তাঁরা ধর্ম পরিবর্তন করতে বাধ্য হন এবং সুলতানের অনুগত হিসেবে দাক্ষিণাত্যের বিদ্রোহ দমন করতে ফিরে আসেন। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল অন্যরকম।

            অরণ্যঘেরা সেই জনপদে তাঁদের সাক্ষাৎ হল মহর্ষি বিদ্যারণ্যের সঙ্গে। ঋষির তেজস্বী বাণী তাঁদের লুপ্তপ্রায় আত্মসম্মানকে জাগিয়ে তুলল। তাঁরা পুনরায় স্বধর্মে ফিরে এলেন এবং ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে নদীর তীরে এক নতুন নগরের পত্তন করলেন— বিজয়নগর।

১৩৩৫ সালে জালালউদ্দিন আহসান খান, দিল্লির তুঘলক শাসনের সেনাপতি দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির সুলতানের থেকে মাসোহারা না পেয়ে ক্রমশ অস্থির হয়ে পড়ছিলেন। তুঘলক বংশের ফাঁপা চেহারাটা স্পষ্ট হচ্ছিল তাঁর কাছে। ধুরন্ধর রণবিশারদ বুঝতে পেরেছিলেন সুদূর দক্ষিণে তাঁদেরকে তুঘলক বংশ করায়ত্ত করতে পারবে না। তাই, পান্ড্য রাজবংশের দুর্বলতার সুযোগে মাদুরাই দখল করেন। তিনি নিজেকে সুলতান ঘোষণা করে স্বাধীন সুলতানি সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তাঁর বংশধররা— সিকান্দার শাহ, নাসিরউদ্দিন দামাজ শাহ— তামিলনাড়ুর বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করে ৪৩ বছর ধরে। মন্দির লুণ্ঠন, জিজিয়া কর আর ধর্মান্তরণের চাপে স্থানীয়রা কাতর হয়ে উঠেছিল।

 

অন্যদিকে নতুন গড়ে ওঠা বিজয়নগর কেবল একটি রাজ্য ছিল না। ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠল সনাতন সংস্কৃতির এক দুর্ভেদ্য ঢাল। আস্তে আস্তে নিজেদেরকে সুরক্ষিত করায় মন দিলেন দুই ভাই।

অশ্বারোহী বাহিনী: সুলতানি ফৌজের সঙ্গে পাল্লা দিতে তাঁরা পর্তুগিজ ও পারস্য বণিকদের থেকে উন্নত মানের ঘোড়া আমদানি করতেন। বীর যোদ্ধারা যখন দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে তলোয়ার উঁচিয়ে রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তখন শত্রুপক্ষ দিশেহারা হয়ে যেত।

            দুর্ভেদ্য প্রাচীর: বিজয়নগর শহরটি সাত স্তরের বিশাল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। এমনকি কৃষিজমি আর কুয়োগুলোও ছিল প্রাচীরের ভিতরে, যাতে দীর্ঘকাল অবরুদ্ধ থাকলেও নগরবাসী অভুক্ত না থাকে।

গজপতি ও অশ্বপতি: বিজয়নগরের রাজারা নিজেদের কেবল শাসক নয়, বরং ধর্মের রক্ষক বলে মনে করতেন। তাঁদের বিশাল পদাতিক বাহিনী জীবন্ত প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত উত্তরের আক্রমণকারীদের সামনে।

            মাদুরাই বিজয়: বুক্ক রায়ের পুত্র কুমার কাম্পানার মাদুরাই অভিযান। সে-সময় সুদূর দক্ষিণে মাদুরাইতে সুলতানি শাসন চলছিল, যা স্থানীয় মানুষের জীবনে অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছিল।

            কুমার কাম্পানা যখন তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন, তাঁর সঙ্গে ছিল বীরত্বের এক আশ্চর্য সংকল্প। এই যুদ্ধের ইতিহাস লিখে গিয়েছেন তাঁর মহিষী, বিদুষী নারী গঙ্গা দেবী, তাঁর সংস্কৃত কাব্য 'মধুরা বিজয়ম'-এ।

বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এই যুদ্ধের দ্বারা। ১৩৭০ সাল নাগাদ মাদুরাই বিজয়ের মহাযুদ্ধ এর আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত। প্রথমে তিনি কাঞ্চিপুরম আক্রমণ করেকাঞ্চির শাসক সেম্ভুব আর চম্পা রায়কে পরাজিত করেন। গঙ্গা দেবীর কাব্যে বর্ণিত, দেবী কামাক্ষী নিজ হস্তে তাঁকে চন্দ্রহাস তলোয়ার দেন।

মহাদেবীর কাব্য থেকে যা জানা যায়। কুমার কাম্পানা তাঁর সেনাবাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করে যুদ্ধ করতেন। অগ্রবর্তী পদাতিকরা শত্রুর পথ আটকে রাখত অর্থাৎ ডিফেন্স। মধ্যভাগ থেকে বেরিয়ে যেত দ্রুতগতি ঘোড়সওয়াররা, চোখের নিমেষে দ্রুত আঘাত হানত। আর পশ্চাদ্বর্তী হাতির দল ত্রাস সৃষ্টি করত। 

সুলতান আলাউদ্দিন সিকান্দার শাহের মাদুরাইয়ের যুদ্ধক্ষেত্রে পতন হলে, সুলতানি সেনার মূল কাঠামো ভেঙে পড়ে। মাদুরাইয়ে মীনাক্ষী মায়ের মন্দিরের দরজা খুলল বহুদিন পর। তবে এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। আরও অগ্রসর হয়ে রামনাথপুরম, রামেশ্বরম, শ্রীরঙ্গমকে যবন মুক্ত করেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত রঙ্গনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণ করেন। দক্ষিণ ভারতে ৫০ বছরের অপশাসনের শাসনের অবসান ঘটে বিজয়নগরের সাম্রাজ্য সমুদ্রপাড় (রামেশ্বরম) অবধি বিস্তৃত হল। আর পরবর্তীকালে এখানে নায়ক ও সেথুপতি রাজবংশের উত্থান ঘটে। সে আর-একদিন আলোচনা করা যাবে।

কুমার কাম্পানার মৃত্যু হয় ১৩৭৪ সালে। গঙ্গা দেবী তাঁর কাব্যে লিখে রেখে গেলেন, “বীরের বিজয়গাথা মৃত্যুরও অতীত।”

উত্তরের রাজপুতরা যদি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল, তবে দক্ষিণের বিজয়নগর ছিল সমুদ্রের মতো উত্তাল। কিন্তু রাজপুতরা যতখানি আলো পেয়েছিলেন, দক্ষিণের বীরেরা পাননি।

 

 ___________________________________________________________________________


প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:

প্রথম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html

দ্বিতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html

তৃতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html

চতুর্থ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

পঞ্চম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

ষষ্ঠ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html 

সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html

অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html

নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html

দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html

ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html

চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html

পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html

ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html

সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html

অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html

ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html

বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html

একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html 

দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html

ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html

চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html

পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html

ষট্‌বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html

সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html

অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html

ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html

ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html

একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html

দ্বাত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post_14.html

 

 

 

মন্তব্যসমূহ