প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর

 

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান

 

তমোঘ্ন নস্কর

 

 

পঞ্চত্রিংশ পর্ব: আজমীরের যুদ্ধ (১১৩৫–১১৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়)

 

যখন তারা এ নগরীর উপকণ্ঠে এসে পৌঁছোল তখন সূর্য মাথার উপর। তার উপর মরুময় পথ বেয়ে তাদের শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই। জলের ভিস্তিগুলো শুকিয়ে খটখটে, মায় কণ্ঠতালু অব্দি থাকলেও এতটুকু আর্দ্রতা উঠে আসছে না

            কয়েকটি আহত ঘোড়া অনেকক্ষণ ধরে ধুঁকছিল। এইবার পড়ে গিয়ে কয়েকবার খিঁচিয়ে স্থির হয়ে গেল। একেবারে ধারের দিকের ঘোড়াটি কাঁটাঝোপের উপর পড়েছিল, থরথর করে কাঁপছিল তার সামনের পা দুটো। সেই দিকে তাকিয়ে ছিল আবু বকর। হঠাৎ তার চোখ গেল ঘোড়াটার পেটের দিকে— কাঁটাঝোপে বিদীর্ণ হয়ে গেছে ঘোড়াটির পেট। সেখান থেকে রক্তধারা গড়িয়ে নামছে। নিজের ঠোঁটটা একবার চেটে নিল আবু বকর। রক্ত সে-ও তো জলের মতোই তরল। আর জল খেতে না পারলে পাগল হয়ে যাবে সে। তার চেয়ে...

            হাঁটু মুড়ে বসে জিভ ঠেকাল সেই নোনতা তরলে... সবাই অবাক হয়ে দেখছিল আবু বকরের দিকে। ভাবল ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় বোধহয় মাথাটাই পাগল হয়ে গেছে তার। না-হলে নিজের প্রিয়তম ঘোড়ার রক্ত পান করে কেউ! কিন্তু আবু বকর যখন আঁজলা করে সেই রক্ত সাথিদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরল, তখন আর না করতে পারল না। কেউ অসুস্থ দুঃস্থ ঘোড়াগুলোর কণ্ঠনালি চিরে আকণ্ঠ রক্তপান করেই নিজেদের তৃপ্ত করল তুর্কি সৈন্যদল।

 

***

 

ভ্রুকুটি কুটিল চোখে মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন অর্ণরাজ। যে গতিতে তুর্কি বাহিনী এগিয়ে আসছিল সেই গতি অনেকখানি মন্দীভূত হয়েছে। আর এতেই তাঁর শাপে বর হয়েছে। সুবিশাল তুর্কি বাহিনীকে খানিকটা আগেই সংঘাতের মুখোমুখি করে দিতে পারবেন তিনি। বিশেষ করে আজমীরের আগে হগ্রুর উপত্যকাতে যদি তাদের আগেই তিনি পৌঁছে যেতে পারেন, তা হলে এই অনমনীয় তুর্কি বাহিনীকে আটকে ফেলা সম্ভব।

            হ্যাঁ, তুর্কিদের যমের মতো ডরাত সে-সময়ে স্থানীয় রাজারা। তার কারণ— মাহমুদ গজনভি। সতেরো বার ভারতবর্ষ আক্রমণ এবং সোমনাথ মন্দিরের শ্রী বিগ্রহ প্রসঙ্গ সবাই জানি। কিন্তু পট বদলায় মাহমুদের মৃত্যুর পর।

            দান্দানাকানের যুদ্ধে সেলজুকরা গজনভি সুলতান মাসউদকে (সুলতান মাহমুদের পুত্র) পরাজিত করে। এই পরাজয় গজনভিদের পারস্য থেকে হটিয়ে দেয় এবং সেলজুকদের জন্য খোরাসান ও পারস্যের পথ খুলে যায়।

            মধ্য এশিয়া থেকে বেরিয়ে সেলজুকরা প্রথমে আধুনিক তুর্কমেনিস্তানের মার্ভ এবং ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ খোরাসান দখল করে। এটি ছিল ভারতের দিকে আসার প্রধান প্রবেশদ্বার। গজনভিদের হটিয়ে সেলজুকরা বর্তমান আফগানিস্তানের হেরাত ও বলখ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

            গজনভিরা তখনও গজনি ও পাঞ্জাব (ভারত) দখল করে রেখেছিল। যদিও সেলজুক সুলতানরা সরাসরি খাইবার পাস অতিক্রম করে ভারত আক্রমণ করেননি, কিন্তু তাদের চাপে পড়ে গজনভি শাসকরা ভারত অভিমুখে পিছিয়ে এলেন। সেলজুকদের ভয়েই গজনভিরা তাদের রাজধানী গজনি থেকে সরিয়ে লাহোরে নিয়ে আসে। এবং আস্তে আস্তে ভারতের দিকে নেমে আসতে থাকে।

 

পথ—

মধ্য এশিয়া (অক্সাস নদী) খোরাসান (ইরান) হেরাত (আফগানিস্তান) সিন্ধু নদ ও পাঞ্জাব সীমান্ত।

 

তাই যখন বাহিনী নিয়ে ভারতবর্ষের উপত্যকায় নেমে এল, তখন ভারতীয় রাজাদের মধ্যে অনেকেই খানিকটা হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলেন।

            বহিরাগত এই বাহিনীর মনে হয়েছিল, ভারতবর্ষের তোরণ দুয়ার আজমীর, কারণ সেই সময় চৌহান বংশের অধীনে থাকা আজমীর সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধিশালী নগর। তাই আজমীরকে পরাস্ত করতে পারলে ভারতবর্ষকে পদানত করা যাবে।

            সেই দিন তাদের সেই অগ্রগতি আটকে দিয়েছিলেন চৌহান সম্রাট।

 

***

অবাক হয়ে তুর্কি বাহিনী দেখল লম্বা লম্বা সোজা তরবারি (খণ্ড) হাতে এক-এক জন রাজপুত বীর যেন সাক্ষাৎ আজরাইল। এত বড়ো ভারী তরবারি কেউ এমন অবলীলায় চালাতে পারে— সেটা বুঝতে বুঝতেই তাদের মাথা নেমে যাচ্ছিল ধড় থেকে। শুকনো মরুপ্রান্তর যতই রক্ত শোষণ করে, তার রক্ত-তৃষ্ণা যেন থামে না। দেখতে দেখতে প্রান্তরখানি ভরে উঠল কর্তিত নরমণ্ডলীতে।

            হস্তি বাহিনীর বৃংহণে ভরে উঠল সেই রণক্ষেত্র, দারুণ আক্রোশে তারা একের-পর এক পিষে ফেলতে লাগল তুর্কিদের শিবিরগুলি। সন্ধ্যার পূর্বে ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত তুর্কি বাহিনী পিছু হটতে শুরু করল।

            এতক্ষন ঘূর্ণির ন্যায় রণক্ষেত্রে তাণ্ডব চালাচ্ছিলেন অর্ণরাজ বা আনাজি চৌহান, এইবার স্থির হলেন তিনি। দুশ্চিন্তা এসে ভিড় করল তাঁর মাথায়।

            মাথার উপর পাক মারতে শুরু করেছে শকুনের দল। সৈন্যদল রণক্ষেত্র থেকে সরে গেলেই তারা নেমে আসবে মৃতদেহগুলির উপর। এক বা দুই রাত্রে এত মৃতদেহ সৎকার সম্ভব নয়। পুঁতি গন্ধে ভরে যাবে এই স্থান। গৃধ্র দল ছোড়াছুড়ি করবে মৃতদেহ নিয়ে  অথচ এই স্থানের অল্প দূরে পুষ্কর হ্রদ। স্বয়ং ব্রহ্মাজি সেখানে অধিষ্ঠান করছেন। মহান ভূমির অন্যতম পবিত্র হ্রদ ও হ্রদসংলগ্ন ঘাট কলুষিত হবে। না, এ হতে দেওয়া যায় না।

            স্থাপত্য শিল্পী ও কারিগরদের আমন্ত্রণ করা হয়। বহতা চন্দ্র নদীর জলধারাকে আটকে, সেই অভিশপ্ত রণক্ষেত্রে প্রবাহিত করা হয়। পবিত্র বারিধারা যখন সেই উপত্যকায় আছড়ে পড়ল, তখন সমস্ত রক্ত আর গ্লানি ধুয়ে-মুছে এক বিশাল জলাশয়ের সৃষ্টি হল।জলাশয়টিই তাঁর নামানুসারে পরিচিত হল ‘আনা সাগর’ নামে।

            শুধু তা-ই না, এ পবিত্র ভূমি কলুষিত করার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করলেন বরাহ মন্দির প্রতিষ্ঠা করে। হিরণ্যকশিপুর ভ্রাতা হিরণ্যাক্ষ ভূমি মা-কে পাতালপুরীতে লুকিয়ে রেখেছিল, তখন ভগবান বিষ্ণু বরাহ রূপ ধারণ করে তাঁর বরাহদন্ত দিয়ে পৃথিবীকে উদ্ধার করেছিলেন। পুষ্করের মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করে সেই ভূমি উদ্ধারের বার্তাকে চিরস্মায়ু করলেন তিনি। এরই সঙ্গে চিরস্মায়ু হল ভারতবর্ষের অনন্য চৌহান বংশের ইতিহাস। আমরা বরাবরই এই সমস্ত ছোট ছোট যুদ্ধগুলিকে এড়িয়ে চলেছি। ভারতবর্ষের প্রবেশদ্বার হওয়ার জন্য এই নির্দিষ্ট অঞ্চলটি যে অজস্র নাম না-জানা, প্রায় মুছে যাওয়া যুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছিল তাদের আমরা একে একে তুলে আনব।

            পাঠক বন্ধুদের সুবিধার জন্য চৌহান বংশ তিলক অর্ণরাজ চৌহানের জীবন আলেখ্য দেওয়া হল।

 

অর্ণরাজ তাঁর পিতা রাজা অজয়রাজ চৌহানের স্থলাভিষিক্ত হন। চৌহানরা মূলত প্রতিহার বংশের উত্তরসূরি। অজয়রাজ চৌহানই হলেন আজমীর শহরের প্রতিষ্ঠাতা। দুর্ভেদ্য অজয় মেরু দুর্গের নাম থেকেই আজমীর।

            ১১২৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ অজয়রাজ স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করে  বাণপ্রস্থ নিয়ে তপোবনে চলে যান এবং পুত্র অর্ণরাজের হাতে সাম্রাজ্যের ভার তুলে দেন।

            সিংহাসনে বসার পরপরই তাঁকে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা গজনভি তুর্কিদের আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়। তরুণ রাজা হিসেবে প্রথমেই সামরিক দক্ষতা প্রমাণ করে তিনি প্রজাদের আস্থা অর্জন করেন।

            আজমীরের নিকটবর্তী এক উপত্যকায় ভয়াবহ যুদ্ধে তিনি গজনভি তুর্কি বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করেন। এই বিজয়ের স্মৃতিতেই তিনি আজমীরে বিখ্যাত ‘আনা সাগর’ হ্রদ খনন করিয়েছিলেন।

 

মালব ও হরিয়ানা অভিযান—

            নরবর্মণের মতো প্রতাপশালী প্রতিবেশী শাসকদের পরাজিত করে মালব অঞ্চলের উপর প্রভাব বিস্তার করেন। এছাড়া উত্তর ভারতের ভাদানক (বর্তমান হরিয়ানা অঞ্চল) শক্তিকেও তিনি দমিত করে রাজ্যকে সুদৃঢ় করেন।

            অর্ণরাজ নিজে শৈব হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য ধর্মের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর রাজসভায় জৈন পণ্ডিতদের (যেমন— ধর্মঘোষ সুরি) বিশেষ সম্মান দেওয়া হত এবং তিনি জৈন মন্দির নির্মাণের জন্য জমিও দান করেছিলেন। রাজা হিসেবে ভীষণ দূরদর্শী ছিলেন অর্ণরাজ, তিনি বুঝেছিলেন প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্কই একটি সুদৃঢ় রাজ্যের ভিত্তি।

            গুজরাটের চালুক্যরাজ জয়সিংহ সিদ্ধরাজের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ ছিল। জয়সিংহের কন্যা কাঞ্চনদেবীকে বিবাহ করে এক শক্তিশালী মৈত্রী গড়ে তোলেন। এবং আজমীর সুরক্ষিত করলেন।

            এই কাঞ্চনদেবী ও অর্ণরাজের সন্তানই হলেন সোমেশ্বর চৌহান। যাঁর পুত্র চৌহান কুলতিলক মহান পৃথ্বীরাজ চৌহান। সেই ইতিহাস আর-একদিন বলা যাবে

 

 ___________________________________________________________________________


প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:

প্রথম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html

দ্বিতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html

তৃতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html

চতুর্থ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

পঞ্চম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

ষষ্ঠ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html 

সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html

অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html

নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html

দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html

ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html

চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html

পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html

ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html

সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html

অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html

ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html

বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html

একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html 

দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html

ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html

চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html

পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html

ষট্‌বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html

সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html

অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html

ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html

ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html

একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html

দ্বাত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post_14.html

ত্রয়োত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post_22.html

চতূস্ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/03/blog-post_2.html

 

 

 

মন্তব্যসমূহ