প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান
তমোঘ্ন নস্কর
চত্বারিংশ পর্ব: মদনমোহনের
মর্ত্যে আগমন
বারুদের ধোঁয়া আর রক্তবর্ণ গোধূলি মিলেমিশে
আশ্চর্য এক বিষাদ নেমেছে বিষ্ণুপুরের আকাশে। নগরের পরিখার চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সৈন্যদের আর্তনাদ আর বর্গীদের অশ্বখুরের শব্দে বাতাস
ভারী। বিষ্ণুপুরের রাজা গোপাল সিংহের সৈন্যদল তখনও মনোবল হারায়নি৷ লড়াই করতে চায়। কিন্তু রাজা অনড়। যুদ্ধ তিনি করবেন না। তিনি
মদনমোহনের সেবা করেন। মানুষকে চারবেলা তাঁর নাম জপতে বলেন।
হেনকালে যুদ্ধের মতো ভয়ংকর কাজে
তিনি নিজেকে কীভাবে লিপ্ত করবেন।
ক্ষোভ জমে সৈন্য এবং সর্দারদের মধ্যে।
এরকম অবস্থা হলে যে সমস্ত মল্লভূম রাজ্য রসাতলে যাবে। বর্গীদের মধ্যে কোনওরকম যোদ্ধাস্বরূপ নীতি নেই, তারা যদি এইভাবে ঢুকে পড়তে পারে শহরে
তা হলে গোটা শহরকে ধূলিস্যাৎ করে
দেবে। বিষ্ণুপুরের সেই শক্তি রয়েছে তাদেরকে বাধা দেওয়ার, অথচ
রাজা গোপাল দেব ভীত, অনড়।
দক্ষিণ দুয়ারের কাছে নগরের বাইরে যে-সকল প্রহরী-রক্ষী-সৈন্য
ছিল, তারা মারা পড়েছে শুধুমাত্র নগরের চারদিক থেকে মূল সৈন্যরা
বর্গীদের ঘিরে ধরে আক্রমণ করেনি বলে। এর দায় রাজার...
রাজা মদনমোহন মন্দিরে ঢুকে দরজা দিয়েছেন।
কেউ তাকে ডাকতে পারে না। ভিতরে ভিতরে অস্থির হয় সর্দার এবং
সৈন্যবাহিনী। মনে মনে তারা বলেন, ‘হে প্রভু মদনমোহন তুমি এ নগরে নিত্যসেবা পাও। তুমি
আমাদের রক্ষাকর্তা, আজ আমাদের রক্ষা করো,
তোমার অনুমতি নিয়ে আমরা সৈন্য সাজালাম।’
প্রস্তুত হয়ে রইল সেনাদল। কিন্তু রাজা
যদি রাজি না হন তা হলে তো আর যুদ্ধ শুরু করা যায় না। প্রভুর
মন্দিরে তিনি প্রভুর জপে ব্যস্ত। আর সৈন্য বাহিনী অস্থিরভাবে ডেকে চলেন প্রভু মদনমোহনকে...
‘লক্ষ লক্ষ নগরবাসী সন্তানের স্বার্থে হে প্রভু আজ তুমি রাজার দৃষ্টি উন্মোচন কর। তুমি
তো নিজেই এ নগরে এসেছিলে প্রভু। তা হলে এ নগরবাসীদের তুমি ছেড়ে যেয়ো না। আমাদের আসল প্রভু
তুমি তুমিই আদেশ দাও। না-হলে তোমার মল্লভূম ধ্বস্ত, বিধ্বস্ত
হবে।’
ঠিক তখনই, মন্দিরে বসে রাজা শুনলেন বজ্রনির্ঘোষ।
যেন গোটা বিষ্ণুপুরের আকাশ জুড়ে মেঘ ডেকে উঠল! এমন তীব্র গর্জন যে মন্দিরের ভারী কাঠের কপাট ঝনঝন করে কেঁপে উঠল!
তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে এলেন রাজা! ভীতসন্ত্রস্ত
হয়ে বললেন, "গোলাবর্ষণ করছে নাকি ওরা! ওই লুঠেরা বর্গিদের
কাছে ভারী গোলাও আছে!”
কিন্তু সম্মুখে থাকা সর্দারদের ঘোর তখনও কাটেনি। তিনি তেমন আশ্চর্যান্বিত স্বরে বললেন, কিন্তু ওই যাযাবর
দস্যুদের কাছে কী এমন গোলা রয়েছে যার এমন ধারা বজ্রনির্ঘোষ হতে পারে!
আর ঠিক সেই সময় ছুটতে ছুটতে এলেন এক
তোপদার, "ভয়ংকর কাণ্ড ঘটেছে
মহারাজ। দলমর্দন কামান তার জায়গায় নেই।"
কথার মাঝে পুনর্বার কামানের গর্জনে কেঁপে
উঠলেন সবাই। তবে কি... কারণ এমন ভীষণ গর্জন ওই কামানের ছাড়া আর কারওর
হতে পারে না। আজ অবধি কেউ ওকে গর্জন করতে শোনেনি। তবে কি ওই
কামান গর্জন করল? কিন্তু কীভাবে সম্ভব? কে টেনে নিয়ে গেল
ওই ভীমকায় কামানটিকে?
তখন যুদ্ধক্ষেত্রে, সন্ধ্যার অন্ধকারে ধুলোর ঝড় উঠেছিল বিষ্ণুপুরের
আকাশে। সেই দিকে তীক্ষ্ণ লক্ষ রেখে দাঁড়িয়েছিলেন বর্গী সর্দার।
এই ধুলোর ঝড় থামলেই তারা দক্ষিণ দুয়ার ভেঙে সোজা নগরে ঢুকে পড়বেন। কিন্তু...
ধুলোর ঝড় ভেদ করে বেরিয়ে এল এক রথ, তার চালক এক বালক। রোগা দীর্ঘ চেহারা। পরনে নীলবসন, কপালে চন্দনের
তিলক, সেই অশ্ব-শকটের বাঁধা রয়েছে দীর্ঘ কামান! আশ্চর্য!
অবিশ্বাস্য! এ তো স্বয়ং দলমর্দন কামান! এ কীভাবে সম্ভব! এ কী দেখছেন তিনি।
ঘোড়ার পেটে চুলকি মেরে বেশ কয়েক কদম
এগিয়ে আসেন তিনি। না, না, ভুল দেখছেন। এটা ভালো করে লক্ষ করতে হবে।
ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামল বালক। বালকের রূপটি
অবিকল বিষ্ণুপুরের মদনমোহনের মতো— স্নিগ্ধ অথচ প্রখর। শত্রু না-হলে
তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতেন তিনি, আহা কী ঢলঢল মুখশ্রী!
বর্গী অশ্ববাহিনী তখন বিষ্ণুপুরের রক্ষাব্যুহ
ভাঙার অপেক্ষায় অধীর। কিন্তু বালকের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে যেন সময় খানিক থমকে গেল।
অশ্বগুলো ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে, একখানা চাপা তরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছে এই বালকের প্রত্যেকটা
পদক্ষেপে। শাণিত তরবারি তাদের হাতের মুঠোয় কাঁপছে। বেশ, অনুভব করতে পারলেন সর্দার।
বালকটি ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এল রণক্ষেত্রের
মাঝখানে, একেবারে তোরণের সন্নিকটে। আক্রমণ করতে উদ্যত হল পশ্চাতে থাকা বর্গির দল। হাত
তুলে তাদেরকে শান্ত করলেন বর্গি সর্দার। এখনও বুঝতে পারছেন
না কী হতে চলেছে! বালকটি ধীরেসুস্থে তার শকট থেকে কামানটি নামাল। এত বড়ো কামান অথচ যেন কোনও ছোট দণ্ড... এ কীভাবে
সম্ভব! এ কি কোনও ভোজবাজি? ভীরু রাজা
ভোজবাজি করছে!
বালকটি গোলা আগুন দিল কামানে। সেই ভীষণ
কামান গর্জে উঠল। না, কোনও গোলার শব্দ নয়; সে এক মহাজাগতিক
শঙ্খধ্বনি— বিষ্ণুপুরের প্রতিটি ধূলিকণা যেন কেঁপে উঠল সেই গর্জনে।
চক্ষের সম্মুখে সেই ভীষণ অগ্নিবলয়কে এগিয়ে
আসতে দেখলেন সর্দার। মৃত্যুর সময় উপস্থিত। কামান গর্জনের মুহূর্তে
তিনি এক শঙ্খধ্বনি শুনেছেন, সেই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেছেন এক অপূর্ব দৃশ্য। ওই বালকের
পদচিহ্ন যেখানে পড়ছে, সেখানেই যেন মাটি থেকে অদ্ভুত এক নীল আভার
ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। উনি আর কেউ নন স্বয়ং মদনমোহন। সেই মদনমোহন, যিনি মধুকৈটভ
সংহার করেন, হিরণ্যকশিপুর বক্ষ চিরে দেন। উনি তো সামান্য এক মানুষ...
চোখ বন্ধ করে মনে মনে স্মরণ করলেন তাঁকে!
হে প্রভু আমার মতো কপট যুদ্ধ ব্যবসায়ীকে তুমি এত দয়া করলে? তা হলে দয়া করে আমাকে তোমার পদতলে স্থান দিয়ো।
ভাবনা শেষ হওয়ার মুহূর্তেই ভীষণ শব্দে অগ্নিগোলাটির পতন হল বর্গী বাহিনীর মধ্যে।
দলমর্দনের সেই ভীষণ গোলার আঘাতে বর্গি বাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ
খড়কুটোর মতো উড়ে গেল।
ডাইনে, বাঁয়ে, মধ্যে কামানটিকে অবহেলায়
স্কন্ধে তুলে সেই বালক ছুটে বেড়াতে লাগল রণক্ষেত্রে। মুহূর্তে ত্রাহিত্রাহি রব উঠল
বর্গি বাহিনীর মধ্যে।
বিষ্ণুপুরের সৈন্যরা, যারা এতক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বের চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছিল, তারাও দেখল ওই বালককে।
গড়
বিষ্ণুপুর সেই সন্ধ্যায় দেখল তাদের ইতিহাসের লৌহস্মারকটি সশরীরে যুদ্ধ করছে। যে-স্মারক কোনওদিন গর্জায়নি, সে-গর্জাচ্ছে
এক অজানা যোদ্ধার জাদুস্পর্শে। বুঝতে পারল না এই অবিশ্বাস্য কীভাবে
ঘটে চলেছে। রাজা গোপালদেব প্রেরিত কোনও ভীষণ যোদ্ধা
ভেবে নিল সেই আগন্তুক বালককে। এ দৃশ্য দেখে তাদের মৃতপ্রায় ধমনিতে যেন নতুন রক্ত সঞ্চারিত
হল। সমবেত রণধ্বনিতে কেঁপে উঠল মল্লভূমের প্রান্তর, “জয় মদনমোহন! জয় বিষ্ণুপুর!”
বর্গীরাও হয়তো বুঝল, এ যুদ্ধ মানুষের
বিরুদ্ধে মানুষের নয়; এ যুদ্ধ মর্ত্যের বিরুদ্ধে অমোঘ শক্তির। একপ্রকার বিনাযুদ্ধেই
পলায়ন করল সে-রাতে।
আশ্চর্যজনকভাবে, বর্গীদের পলায়নের সঙ্গে সঙ্গে এসে ধুলোর ঝড় থিতিয়ে এল! প্রান্তর জনশূন্য! কোথায়
সেই বালক! কোথায় তার ঘোড়ায়-টানা-শকট!
শুধু পড়ে আছে দলমর্দন কামানটি, তার তপ্তগর্ভ থেকে বারুদের গন্ধ ছাপিয়েও তীব্র হয়ে উঠে
আসছে ধূপ আর চন্দনের গন্ধ।
অন্যদিকে, কামানের নির্ঘোষ শুনে সৈন্যসাথিরা রণক্ষেত্রের
দিকে পা বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু রাজা গোপাল দেব না পরেছিলেন যুদ্ধসাজ, না গিয়েছিলেন
রণক্ষেত্রে। তিনি তার প্রভুর পদপ্রান্তে বসে রইলেন, “হে মদনমোহন
আমি তোমায় ছেড়ে যাব না। যা-ই হয়ে যাক না কেন!”
দুধওয়ালার ডাকে সাড়া ফিরল। এই ঘোষেরা
নিয়মিত মদনমোহনের সেবার জন্য ছানা দিয়ে যায়। আজও এসেছে সান্ধ্যসেবা আর ছানা দিতে...
আজ কোনও চাকর, রক্ষী নেই৷ রাজা নিজেই সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেন! ও মা কোথায় কী? এ তো খালি হাতে এসেছে! রেগে অগ্নি শর্মা হয়ে রাজা
বললেন, “ছানা কই? প্রভু খাবেন কী?”
অবাক হয়ে ঘোষ বললেন, “কেন রাজামশাই সেই ছেলেটি ছানা নিয়ে আসেনি! আমি দুধ দুয়ে ছানা
কেটে জমাট করছিলাম। একটি ছেলে এল, এসে বলল রাজামশাইয়ের নির্দেশে এসেছে। ছানা নিয়ে যেতে... আজকে নাকি যুদ্ধের কারণে আপনি তাড়াতাড়ি ভোগ দেবেন!
“সেই কখন নিয়ে এসেছে সব। আমি আসতুম নে।
কিন্তু আসার সময় ওর হাত থেকে এই বালাখানা বোধহয় খুলে গেছে,
তাই দিতে এলুম। আপনার রাজবাড়ির লোক এখানে যদি কোথাও দেখা পাই, না-হলে রক্ষীকে দিয়ে যাব।”
গোপাল দেব এই গল্প বিশ্বাস করলেন না।
গর্জন করে ঘোষকে বললেন, “কই দেখি তোর বালা?”
বুড়ো ঘোষ কাঁপতে কাঁপতে কোমরের গাঁট
থেকে বালাখানা এগিয়ে দিল। অন্ধকারে বালা হাতে নিয়ে বুঝতে পারলেন গোপাল দেব, এই মকরমুখী
বালা আর কারও হতে পারে না। তাড়াতাড়ি নিয়ে ছুটলেন মন্দির
ঘরে। উজ্জ্বল প্রদীপের আলোয় একবার তাকান সেই বালার দিকে, আর-একবার তাকান মদনমোহনের হাতের দিকে— সে-হাত
শূন্য!
হাউহাউ করে কেঁদে পড়েন রাজা— প্রভু এত
সেবা করলাম তোমার, তবুও তুমি দেখা দিলে না। অথচ ঘোষ তোমার দেখা পেল। দখিনা বাতাস পাক
মারে বাতাসে, ধুলোর ঝড় ওঠে প্রাঙ্গণে, কানের কাছে ফিসফিস করে
যেন কেউ বলে গেল, "ওরে তোর জন্য যুদ্ধ করলাম যে বড়ো!
আমার যে খিদে পেয়েছে, খিদে পেলে লোক তো মায়ের কাছেই যায়।"
গোটা মল্লভূম জেনে গেল— যতদিন দলমর্দন
তথা দলমাদল আছে, ততদিন মদনমোহন আছেন।
এই অংশটি ছিল লোককথা। জনপ্রিয় লোককথাটিকে
আশ্রয় করে, বহু গল্প বহু দেয়াল চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। আমিও নিজের মতো করে ভাবলাম।
তবে এই যুদ্ধের ঘটনা সর্বৈব সত্যি। বর্গীদের পলায়নের ঘটনাও সত্যি।
একটু ইতিহাস
বর্গী বলতে মারাঠা সাম্রাজ্যের সেই অশ্বারোহী
সৈন্যদের বোঝায়, যারা ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সালের মধ্যে বারবার বাংলা আক্রমণ করেছিল।
মারাঠা সেনাবাহিনীতে দুই ধরনের অশ্বারোহী
ছিল—
শিলাদার: যারা নিজেদের ঘোড়া এবং অস্ত্র
নিজেরাই জোগাড় করত।
এবং
বারগির: যারা রাষ্ট্র বা রাজার পক্ষ থেকে
ঘোড়া ও অস্ত্র পেত। এই 'বারগির' শব্দটিই বাংলায় বিবর্তিত হয়ে 'বর্গী' নাম ধারণ করে।
মারাঠা সাম্রাজ্য বহুধা ভাগে বিভক্ত হওয়ার পর নাগপুরের রাজা রঘুজি ভোঁসলে বাংলার
উপর 'চৌথ' (মোট আয়ের চার ভাগের এক ভাগ কর) দাবি করেছিলেন।
কারণ মারাঠাদের আয়ের অন্যতম উৎসই ছিল প্রতিবেশী রাজ্যগুলো থেকে 'চৌথ' (রাজ্যের মোট
আয়ের ২৫%) এবং 'সরদেশমুখী' (১০%) কর আদায় করা। মুঘল সম্রাট এবং বাংলার নবাব এই কর দিতে
রাজি না হওয়ায় মারাঠারা শক্তির জোরে তা আদায়ের চেষ্টা করত।
তবে বাংলায় বর্গী হানা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, মুঘল মদতপুষ্ট বাংলার নবাব আলীবর্দী খাঁ
যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন তাঁর দরবারে অনেক অসন্তুষ্ট অভিজাত ব্যক্তি ছিলেন। ওড়িশার নায়েব-নাজিম
মির্জা বাকর খাঁ এবং আলীবর্দীর সেনাপতি মীর হাবিব নবাবের উপর প্রতিশোধ
নিতে রঘুজি ভোঁসলেকে বাংলা আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান।
রঘুজি ভোঁসলের
সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে প্রায় ৪০,০০০ অশ্বারোহী বর্গী সৈন্য মেদিনীপুর ও
বর্ধমান হয়ে বাংলায় প্রবেশ করে। তারা কাটোয়া দখল করে এবং সেখান থেকে হুগলি ও মেদিনীপুর
পর্যন্ত লুঠতরাজ চালায়। আলীবর্দী খাঁ অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে তাদের মোকাবিলা করেন।
বর্গী আক্রমণ বাংলার ইতিহাসে একটি ভয়াবহ
অধ্যায়। তাদের আক্রমণের প্রকৃতি ছিল অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। তারা গ্রামকে-গ্রাম জ্বালিয়ে দিত এবং ধনসম্পদ লুঠ করত।
বর্গীদের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাত, যার ফলে বাংলার কৃষি ও অর্থনীতি
ভেঙে পড়েছিল।
টানা দশ বছর যুদ্ধের পর ১৭৫১ সালে নবাব
আলীবর্দী খাঁ এবং মারাঠাদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত
অনুযায়ী:
(১) নবাব মারাঠাদের ওড়িশা প্রদেশটি ছেড়ে দেন।
(২) বাৎসরিক ১২ লক্ষ টাকা 'চৌথ' দিতে রাজি হন।
এর মাধ্যমেই বাংলায় দীর্ঘস্থায়ী বর্গী
হাঙ্গামার অবসান ঘটে।
তবে, বিষ্ণুপুরের গাথা
স্বতন্ত্র। বিষ্ণুপুর বা মল্লভূমের ইতিহাসে বর্গী আক্রমণ বীরত্বগাথা এবং অলৌকিক বিশ্বাসের
সংমিশ্রণ। যখন বাংলার অন্যান্য অঞ্চল বর্গীদের অত্যাচারে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল,
তখন বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজারা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাদের
প্রতিহত করেছিলেন।
১৭৪২ থেকে ১৭৪৮ সালের মধ্যে মারাঠা বর্গীরা
বারবার বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে। বিষ্ণুপুর ছিল তৎকালীন বাংলার একটি শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ
রাজ্য। এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং চারপাশের দুর্ভেদ্য গড় (প্রাচীর) বর্গীদের নজর কেড়েছিল।
নাগপুরের মারাঠা সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বর্গী বাহিনী বিষ্ণুপুর দুর্গ দখলের
চেষ্টা চালায়।
সে-সময় বিষ্ণুপুরের
রাজা ছিলেন পরম বৈষ্ণব গোপাল সিংহ। তিনি অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ছিলেন। প্রচলিত আছে যে,
বর্গীরা যখন বিষ্ণুপুর ঘিরে ফেলে, তখন রাজা গোপাল সিংহ প্রজাদের অস্ত্র হাতে লড়াই করার
বদলে মন্দির প্রাঙ্গণে সমবেত হয়ে ভগবানের নাম জপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কথিত আছে, যখন বর্গীরা দুর্গের খুব কাছে
চলে আসে, তখন স্বয়ং বিষ্ণুপুরের কুলদেবতা মদনমোহন এক সৈনিকের বেশ ধারণ করেন।
তিনি বিশাল 'দলমাদল' কামানটি একা পরিচালনা
করেন এবং বর্গীদের লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করেন। গোলার আঘাতে বর্গী বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে
যায় এবং প্রাণভয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মল্ল রাজাদের
শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং বিশাল এই কামানের নিখুঁত নিশানাই বর্গীদের হটিয়ে দিয়েছিল।
আজও বিষ্ণুপুরে সেই বিশাল 'দলমাদল' কামানটি সংরক্ষিত আছে।
পরবর্তীতে মল্লভূমিকে রক্ষা করার জন্য
মল্ল রাজারা শহরের চারপাশে সাতটি বিশাল দিঘি এবং উঁচু মাটির প্রাচীর (গড়) তৈরি করেছিলেন।
বর্গীদের অশ্বারোহী বাহিনী এই বিশাল জলাধার এবং কাদা পার হয়ে দুর্গে প্রবেশ করতে ব্যর্থ
হয়েছিল। এটি ছিল মল্ল রাজাদের উন্নত সামরিক প্রকৌশলের নিদর্শন।
বাংলার নবাব এবং জমিদারকুল বর্গীদের কাছে
নতিস্বীকার করলেও বিষ্ণুপুর তাদের তেজস্বিতা বজায় রেখেছিল।
তবে সামরিকভাবে বর্গীরা বিষ্ণুপুর জয়
করতে না পারলেও এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ফলে মল্লভূম রাজ্যের কোশাগার
শূন্য হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বর্গীদের সঙ্গে সমঝোতা এবং
মারাঠা হাঙ্গামার প্রভাবে বিষ্ণুপুরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কমতে শুরু করে।
বিষ্ণুপুরের ইতিহাসে এই বর্গী আক্রমণ
কেবল একটি যুদ্ধ নয়, বরং এটি মল্ল রাজাদের শৌর্য এবং মদনমোহনের প্রতি তাদের অবিচল ভক্তির
এক চিরস্থায়ী প্রতীক হয়ে আছে।
___________________________________________________________________________
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:
প্রথম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html
দ্বিতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html
তৃতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html
চতুর্থ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
পঞ্চম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
ষষ্ঠ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html
সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html
অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html
নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html
দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html
ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html
চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html
পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html
ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html
সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html
অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html
ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html
বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html
একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html
দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html
ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html
চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html
পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html
ষট্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html
সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html
অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html
ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html
ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html
একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html
