প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান
তমোঘ্ন নস্কর
ষটত্রিংশ
পর্ব: ধুরন্ধর
বহরমপুর স্টেশনের আরপিএফ-এর ঘরে বসে ক্রমশ বিরক্তি বেড়েই চলেছে
পিটারের। সে পিটার বার্লি কলকাতার আমেরিকান কনস্যুলেটের একজন অফিসার, আর তাকে নাকি আটকে রেখেছে রেল পুলিশ! বারবার আই-কার্ড দেখিয়েও লাভ হচ্ছে না। এমন সময়ে
ঘরের দরজা খুলে একজন লোক ঢুকল...
শ্যামবর্ণ দীর্ঘদেহী লোকটার পরনে সাধারণ
শার্ট-প্যান্ট, মুখের জ্বলন্ত চারমিনারে শেষ
টানটা মেরে গুঁজে দিল অ্যাশট্রেতে। তারপর বার্লির উল্টোদিকের চেয়ারটায় বসে পায়ের
উপর পা তুলে আর-একটা সিগারেট ধরিয়ে একপ্রস্থ ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
"So Mr.
Burly how was your meeting with the Chogyal?"
প্রশ্নে হকচকিত পিটার বার্লি কিছু উত্তর
দেওয়ার আগেই লোকটি আবার বলে উঠলেন, "We know everything about you Peter. How you came
in here as a CIA asset in disguise of a Foreign Officer. Don't worry you're not
under arrest, I'll personally escort you to Kolkata once you answer my simple
questions." উত্তর দিতে নারাজ বার্লির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে লোকটা তাকে মনে
করিয়ে দিলেন কিছু
মাস আগে কলকাতার এক থানায় শ্লীলতাহানির অভিযোগ নিয়ে আসা এক মেয়ের কথা। কথা শুনে
পিটার বার্লির রক্ত ঠান্ডা হয়ে
গেল...
"I told you Mr. Burley we know everything about you." মুহূর্তের মধ্যে সিগারেট ধরা সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখটা পাথরের মতো কঠিন হয়ে
গেল, "Now it's upon you if you don't answer get ready to spend your life
in a Kolkata
jail." বার্লির গলা শুকিয়ে এসেছে, হড়হড় করে সে বলে দিল সিআইএ-র সমস্ত প্ল্যান।
সিগারেটে টান দিতে দিতে লম্বা লোকটি পায়ের উপর পা তুলে সব কথা শুনলেন, কথা
শেষ হলে উঠে দাঁড়িয়ে পিটার বার্লির কাঁধে হাত রেখে বললেন, "My boss Mr. Kao would be very happy to get these news. And
for your kind information, though in CIA books I'm known as Nath Babu, but my
friend my real name is Phanindra Nath Banerjee."
এইবার অনেকগুলি কথা বলতে হবে, এই যে চোগিয়াল
ইনি কে? ইনি হচ্ছেন সিকিমের রাজা। সিকিমের ভারতভুক্তির অন্যতম কারিগর এই সিগারেট খাওয়া
নাথবাবু। সিআইএ খুব চেষ্টা করেছিল সিকিমকে আটকাতে— সিকিমের শেষ রাজা পালডেন নামগ্যেলের
স্ত্রী ছিলেন আমেরিকান নাগরিক হোপ কুক। তিনি আসার পরে এই সিকিমের ভারতভুক্তির প্রশ্নগুলি
সমস্যার সম্মুখীন হয়।
নানা রকম রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি সরাসরি
হস্তক্ষেপ করা শুরু করেন। মনে করা হয় তিনিই ছিলেন সিআইএ-র তরফে নিযুক্ত করা ট্রোজান
হর্স বা গুপ্তচর। এমতাবস্থায় পাশের রাজ্যটির ভারতভুক্তি নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান ভারতের
তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মাননীয়া ইন্দিরা গান্ধী। কারণ সেই সময়ে সিকিমের বেশিরভাগ
রাজনৈতিক অবস্থান ভারতের সঙ্গে জুড়তে চাইছিল। এবং ১৯৬২-এর যুদ্ধের পর সিকিমের অবস্থান সুরক্ষিত
করা ভারতবর্ষের সুরক্ষার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পাস/গিরিপথ
সিকিমের অধীনে। এবং সিকিম স্বাধীন রাজ্য থাকলে বা চীনের অন্তর্ভুক্ত হলে সেই পাসটি
অসুরক্ষিত বা অসংরক্ষিত রয়ে যাবে। অতএব মাননীয়া ইন্দিরা গান্ধীর তরফে তিনি মানে আমাদের
নাথবাবুকে পাঠানো হল। এই অপারেশনের নাম দেওয়া হল অপারেশন টুইলাইট। সিকিমের ভারতভুক্তি অর্থাৎ অপারেশন
টুইলাইট-এ
তিনি নেতৃত্ব দিলেন, সঙ্গী হলেন অজিত সিং শ্যালি ও গুরুবক্স সিং।
পিটার বার্লি দুর্ধর্ষ ফিল্ড এজেন্ট কিন্তু
সবারই কিছু-না-কিছু দুর্বলতা থাকে। আর কে না জানে গুপ্তচর
দুনিয়ার অন্যতম অস্ত্রহানি সেখানেই ফাঁদে পড়েছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে জাল গুটিয়ে আনেন
নাথবাবু। ১৯৭৩ সালে সন্তানাদি নিয়ে সিকিম ছেড়ে পাকাপাকি আমেরিকায় চলে যান রাজমাতা হোপ কুক এবং ১৯৭৫
সালে ভারতভুক্তি হয় সিকিমের।
ফণীন্দ্র নাথ ব্যানার্জি যিনি পি. এন. ব্যানার্জি এবং নাথবাবু নামে পরিচিত ছিলেন— ১৯৭১ যুদ্ধের ভারতবর্ষের বিজম
এবং সিকিমের ভারতভুক্তির এক বিস্মৃত নায়ক।
বাংলাদেশ যুদ্ধের আগে ও যুদ্ধ চলাকালীন তিনি ছিলেন
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কো-অর্ডিনেটর তথা—
১. পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সমস্ত প্রকাশ্য এবং
গেরিলা অপারেশনের প্রধান
২. মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ বিভাগের প্রধান
এবং
৩. বাংলাদেশের Government in Exile-এ ভারতীয় পক্ষের সার্বিক প্রধান।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর
এবং প্রেসিডেন্সি থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনার পর ১৯৪৯-এ Emergency Recruitment Scheme-এর মাধ্যমে ব্যানার্জি ভারতীয় পুলিশে যোগদান করেন। বাঁকুড়া ও ত্রিপুরায় এক দশক চাকরির
পর তিনি ইনটেলিজেন্স ব্যুরোতে যোগদান করেন ১৯৫৯ সালে। আইবি প্রধান কিংবদন্তি রামেশ্বর
নাথ কাও-এর
অত্যন্ত প্রিয় পাত্র পি. এন. ব্যানার্জি নিজের
বসের সঙ্গে
আইবি ছেড়ে যোগদান করেন স্পেশাল ব্যুরো R&AW field formation-এ।
পূর্ব পাকিস্তান ও উত্তর-পূর্ব ভারত জুড়ে ছিল ব্যানার্জির বিশাল নেটওয়ার্ক। ব্যানার্জি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী নেতৃবৃন্দ এবং ভারত সরকারের
মধ্যে সংযোগকারী। ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের মিটিং হয়েছিল লন্ডনের সাউদাম্পটন রোডে তারাপদ
বসুর বাড়িতে, এই মিটিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন ব্যানার্জি। ১৯৬৯-এর অক্টোবরে মুজিবুর ভারতে আসেন অপারেশনের নাম করে এবং ব্যানার্জির মাধ্যমে ভারত সরকারের সঙ্গে সমস্ত রকম অপারেশনের প্ল্যানিং হয়ে যায়। এরপর উত্তর-পূর্ব ভারতে বিদ্রোহ ও পশ্চিমবঙ্গে নকশাল
দমনের নাম করে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা প্রেরণ শুরু করে ভারত আর সঙ্গে শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন ট্রেনিং। এই সমস্ত কার্যক্রমের
মাথা ছিলেন পি.
এন. ব্যানার্জি। ১৯৭১-এ সিআইএ-এর চোখ এড়িয়ে জন্মগ্রহণ করে বাংলাদেশ।
আবার ১৯৭২-এ ব্যানার্জি যোগদান করেন সিকিমের ভারতভুক্তি অপারেশনে। কাজী লেন্ডুপ দর্জীর
সাহায্যে সিকিম থেকে রাজতন্ত্র উপড়ে ফেলে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রজাতন্ত্র এবং সিকিম হয়ে
ওঠে ভারতের ২২তম রাজ্য।
১৯৭৪ সালের ২৪ জুলাই শ্রী ফণীন্দ্র নাথ
ব্যানার্জি ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যদিও তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল
না এবং সিআইএ তাঁকে হত্যা করে বলে অনেকের মত। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই মুজিবুর
রহমান খুন হন।
ফণীন্দ্র নাথ ব্যানার্জি আমাদের সকলের গর্ব। ইন্টারনেটে তাঁর একটিমাত্র ছবি পাওয়া
যায়, যেখানে মুজিবুর রহমানের পরিবারের সঙ্গে তিনি রয়েছেন। ছবিতে মুজিবের পাশে বসা দীর্ঘদেহী ব্যক্তিই পি. এন. ব্যানার্জি।
তথ্যসূত্র:
(১) বাংলাপ্রেমিক গবেষক ও লেখক সৌম্যদীপ ব্যানার্জি
(২) RN Kao The Gentleman Spymaster, Nitin A Gokhale
(৩) History of Services of Indian Police Service as on 1st January 1960, Ministry of Home Affairs, Government of India, 1961
(৪) মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন দলিলপত্র, Muntassir Mamoon
(৫) How RN Kao and his team created India’s espionage playbook through the Research & Analysis Wing, excerpt from The War That Made R&AW, Anusha Nandakumar & Sandeep Saket, Scroll.in, 15 April 2021
(৬) 1971 Bangladesh war: RAW heroes India forgot to honour, R. K. Yadav, 16 December 2015
(৭) The
Ghosts of RAW, Subir Bhaumik, bdnews24.com, 17 March 2017
(৮) Death of R&AW officer in Dhaka in 1974 linked to Mujib assassination plot, claims book". www.thehindu.com. Retrieved 27 June 2025
___________________________________________________________________________
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:
প্রথম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html
দ্বিতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html
তৃতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html
চতুর্থ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
পঞ্চম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
ষষ্ঠ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html
সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html
অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html
নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html
দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html
ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html
চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html
পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html
ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html
সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html
অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html
ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html
বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html
একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html
দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html
ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html
চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html
পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html
ষট্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html
সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html
অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html
ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html
ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html
একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html
