প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর
প্রতিরোধে বীর
ভারত-সন্তান
তমোঘ্ন নস্কর
ঊনচত্বারিংশ পর্ব: ভিখারি রাজা
সন্ধ্যায় রণপ্রান্তের দেব শিবিরে শাঁখ বেজে উঠল। জয় জগন্নাথ
ধ্বনিতে মুখরিত হল
প্রাঙ্গণ।
বাহমনি সুলতানের পতাকা ধুলোয় লুটোচ্ছিল। কপিলেন্দ্র দেব দাঁড়িয়ে ছিলেন কৃষ্ণা নদীর
তীরে। নিজে নিচু হয়ে সেই পতাকা কুড়িয়ে তারপর সযত্নে ভাঁজ করে সৈনিকের হাতে দিয়ে বললেন, “দেখো, পতাকার
যেন অযত্ন না হয়।” অবাক
হয়ে সসম্ভ্রমে সৈনিকটি দেখল তাদের
রাজার সারা গায়ে যুদ্ধের ক্ষত, কিন্তু
মুখমণ্ডলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
ইতিহাসের খাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হল ঔড্রদেশের এক সামান্য
ভিক্ষুকের দিগ্বিজয়ের গল্প। যিনি বুঝিয়ে ছিলেন, কেবল সংখ্যা দিয়ে
যুদ্ধ জেতা যায় না; যুদ্ধ জিততে হয় রণকৌশল আর হার না-মানা জেদ দিয়ে।
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু চরিত্র থাকে যারা
শূন্য থেকে শুরু করে আকাশ ছোঁয়ার স্পর্ধা রাখে। ওড়িশার মধ্যযুগীয় ইতিহাসের
সবচেয়ে শক্তিশালী এবং তেজস্বী সম্রাট গজপতি কপিলেন্দ্র দেব ছিলেন
তেমনই এক ব্যক্তিত্ব।
স্বপ্ন দর্শন
রোজ প্রভাতে দৈতাপতির পিছু পিছু মন্দিরের প্রাঙ্গণে এসে
দাঁড়ায় রাজার রথ। রাজা সাহস করে রথ থেকে নামতে পারেন না। প্রভু তাঁকে
মন্দিরে যেতে বারণ করে রেখেছেন। তাই পথেই লুটিয়ে আকুল হয়ে কাঁদেন রাজা, "হে
প্রভু, কী
পাপের ফলে আমায় তুমি এমন শাস্তি দিচ্ছ! আমার কোনও সন্তানাদি আপনি দিলেন না! তা
হলে আমার পরে আপনার দায়িত্ব কে নেবে?
আপনার মন্দিরে এমনভাবে পড়ে রইবে!
বাইরে থেকে শত্রুর পদধ্বনি শুনতে পাই আমি।
“মন্দির
সুরক্ষিত করে না যেতে পারলে আমি
যে দু’চোখ বুঝেও শান্তি পাব না প্রভু। প্রেতের মতো
ঘুরে বেড়াতে হবে আপনার এই মন্দিরের দুয়ারে। আপনি উপায় করুন প্রভু আপনি বৃদ্ধ রাজার
উপায় করুন।”
সেদিনও অমন কাঁদছিলেন। মন্দিরের সমুখের ভিখারি ছেলেটি অবোধ মুখ করে এসে তাঁর
সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “রাজা তুমি কাঁদছ কেন?”
এমন কথায় রাজার রাগ হওয়ার কথা! কিন্তু বৃদ্ধ রাজা ততদিনে
অনুতাপের, শোকের
আগুনে পুড়ে রাজা আর নেই।
তাঁর হৃদয় কেবল সন্তানের মুখ খোঁজে। কালিঝুলিমাখা, শীর্ণ
ভিখারি বালকের উজ্জ্বল চোখ
দু’টি দেখে ভারী মায়া হয় তাঁর।
সবকিছু ভুলে তার থুতনিতে একটা চুমা দিয়ে হাত থেকে সোনার বালাখানি খুলে
দিয়ে বলেন, “এই
যে তোমায় ভিক্ষা করে খেতে হয় বাবা, এর
যেমন কষ্ট আমারও তেমনি কোনও কষ্ট আছে...”
পরদিন প্রভাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন রাজা।
সেই ভিখারি বালক জগন্নাথ মন্দিরের বাইরে একটি গণ্ডি কেটে দিচ্ছে। সে আর ভিখারি
নেই। তার গলায় স্বর্ণ হার, বাজুতে স্বর্ণ কঙ্কণ,
সে হাতে ধরে আছে গরুড়ধ্বজ দণ্ড— তাঁদের
রাজ অভিজ্ঞান। খরদ্বিপ্রহরে জগন্নাথ মন্দিরের ছায়া যেন
ওই বালকের উপরে ন্যস্ত। ঘুম ভেঙে তাড়াতাড়ি ছুটে এলেন রাজা। সেখানে
তখন মহাধুন্ধুমার।
বালকের কাছে রাজ অভিজ্ঞান দেওয়া স্বর্ণকঙ্কণ পেয়ে
সবাই চোর বলে তাকে মারতে শুরু করেছে। ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন রাজা। আর ঠিক
সেই সময় প্রভুর মন্দির থেকে ভীষণ জোরে ঘণ্টা নাদ হল।
বালককে রথে চাপিয়ে ফিরে নিয়ে চললেন রাজধানীতে।
পথে যেতে যেতে প্রশ্ন করলেন রাজা, "তুমি রোজ
কী চাইতে?"
বালক বলল, "আমি কেবল প্রভুর কাছে দু’মুঠো
খেতে চাইতাম।"
রাজা বললেন,
"আমি চাইতাম সন্তান।"
দৈতাপতি ঠিকই বলেছিলেন,
"মন্দিরের দুয়ারে
বছরকাল কেউ আকুল হয়ে ভিক্ষা মাংলে,
প্রভু তাকে প্রসাদ দেন।"
কালের নিয়মে গঙ্গাবংশের শেষ রাজা সেই ভিখারি
বালকের পালিত পিতা গত হলেন। ১৪৩৫
খ্রিস্টাব্দে সেই বালক কপিলেন্দ্র দেব সিংহাসনে বসলেন এবং
প্রতিষ্ঠা করলেন সূর্যবংশীয়
গজপতি সাম্রাজ্য।
গৌড়ের সুলতানি শাসন ও স্বজাতি রক্ষা
সিংহাসনে বসে প্রথমে তিনি যে-বিষয়টি লক্ষ করলেন, সেটি
হল গৌড়ের সুলতানদের দম্ভ আকাশচুম্বী। তারা বঙ্গদেশের দেবদেউল সকলই ধ্বংস করেছে, ধ্বংস
করেছে বৌদ্ধ বিহার এবং স্তূপগুলি। এইবার তাদের নজর
ছিল উড়িষ্যার সমৃদ্ধ উপকূল ও মন্দিরের সম্পদের দিকে।
রাজা কপিলেন্দ্র দেব ডিফেন্সিভ অর্থাৎ প্রতিরক্ষার
চেয়ে আগ্রাসনে বিশ্বাস করতেন, তাই তিনি সরাসরি আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে বঙ্গের দিকে এগোলেন।
দন্তপুর (অধুনা দাঁতন) ও
মেদিনীপুরের দখল
কপিলেন্দ্র দেবের প্রথম লক্ষ্য ছিল বর্তমান মেদিনীপুর এবং
হুগলি পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল। বাংলার সুলতানরা এই অঞ্চলগুলোকে
তাঁদের নিজস্ব বলয় মনে করতেন।
কপিলেন্দ্র দেবের বাহিনী যখন মেদিনীপুর অভিমুখে
অগ্রসর হয়, তখন সুলতানি বাহিনী তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সমরকুশলী রাজা দীর্ঘদিন ধরে নিজের বাহিনীকে লক্ষ
করে বুঝেছিলেন তাঁর সমর
শক্তির সেনাবাহিনীরা কেউ একেবারে সম্মুখ সমরে পারদর্শী নয়।
কারণ তারা দেশজ যোদ্ধা এবং পাইক।
এদিকে সুলতানের সৈন্যবাহিনী মধ্যএশিয়ার বেতনভুক
যুদ্ধব্যবসায়ী, তাতার, তুর্কি, আফগানদের সম্মিলিত শক্তির কাছে তারা সম্মুখ যুদ্ধে পারবে
না। তাই তিনি গরিলা যুদ্ধের পন্থা
অবলম্বন করেছিলেন।
সুলতানের সেনারা মূলত পাহাড় বা সমতলের যুদ্ধে
দক্ষ ছিল। কিন্তু কপিলেন্দ্র দেব তাদের এমন সব জলে-জঙ্গুলে জায়গায় লড়াইয়ে টেনে আনতেন, যেখানে
সম্মুখ সমরে হাতি আর চোরাগোপ্তা আন্দোলনে পাইকরা অপ্রতিরোধ্য। তাদের খাটো
তলোয়ার, ধারালো
সড়কি, পাঁক
আর জলাভূমিতে অপ্রতিরোধ্য গতি নাস্তানাবুদ করে দিত দুর্ধর্ষ
তুর্কি বাহিনীকেও।
রূপনারায়ণ এবং দামোদর নদকে কেন্দ্র করে ছোটো
ছোটো নৌ-যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছিল। সুলতানি বৃহত্তর নৌবহর যখন নদীর অগভীর অংশে
আটকে যেত, তখনই
গজপতির নৌ-বাহিনীর ছোটো ছোটো ছিপগুলো তাদের ঘিরে ফেলে, তাদের
পাল্লা থেকে দূরে গাছপালার আড়াল
থেকে তাদের
উপর অগ্নিবাণ
ও গোলা নিক্ষেপ করত। আসলে সুলতানের বাহিনী বঙ্গদেশের
চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত ছিল। কিন্তু ঔড্রদেশ বঙ্গের
প্রতিবেশী হওয়ায় এই বদ্বীপ সম্বলিত অঞ্চল কেমন করে সামলাতে হয় তারা ভালোই
জানত। এবং
নিত্যনৈমিত্তিক সমুদ্রের সঙ্গেই লড়াই করে যুঝতে হয় যাদের, তাদের
চেয়ে নৌপারদর্শী আর কে হবে? অবস্থা এমন দাঁড়ায় সুলতানরা নাস্তানাবুদ
হয়ে উত্তর ভারতের রাজনীতির দিকে মনোনিবেশ করেন।
বাংলার সুলতানদের সঙ্গে কপিলেন্দ্র
দেবের এই সংঘাত শেষপর্যন্ত এক ধরনের 'স্ট্যাটাস কুয়ো'
বা স্থিতাবস্থায় পরিণত হয়। গঙ্গা নদীর তীরের কিছু অংশ নিয়ে
দুই শক্তির মধ্যে অলিখিত বোঝাপড়া তৈরি হয়। এই যুদ্ধের পর থেকেই ওড়িশা কেবল এক
প্রাদেশিক রাজ্য নয়, বরং ভারতের
এক শক্তিশালী সার্বভৌম শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।
আর এই আক্রমণ বাংলার বহু দেবদেউলকে শক্ত হাতে রক্ষা করে এবং পরবর্তীতে বাংলার
বারোভুঁইয়ার ভিত শক্ত করে।
বাহমনি সাম্রাজ্য
১৪৫৮-১৪৫৯
খ্রিস্টাব্দে বাহমনি সুলতান হুমায়ূন শাহের লক্ষ্য ছিল
বিস্তীর্ণ তেলেঙ্গানা অঞ্চল কবজা করা। এই অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হলে আশপাশের
অঞ্চলগুলিতে ঘোর দুর্যোগ নেমে আসত।
তাই মাঝপথে
পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেলেন কপিলেন্দ্র দেব।
দেউলকুন্ডা দুর্গ
সুলতানি বাহিনী অগ্রসর হয়ে প্রথমেই দেউলকুন্ডা দুর্গ অবরোধ
করলে, তখন
দুর্গাধিপতি নিকটবর্তী গজপতি কপিলেন্দ্র দেবের সাহায্য প্রার্থনা করেন। তিনিও
যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার জন্য একটি সুযোগ খুঁজলেন। ব্যস, কপিলেন্দ্র
দেব তাঁর সুযোগ্য পুত্র হাম্বীর
দেবকে এক বিশাল বাহিনী দিয়ে পাঠালেন।
বাহমনি সৈন্যগণ দুর্গ অবরোধ করে বসল। এইদিকে হাম্বীর
দেবের নেতৃত্বে ঔড্র বাহিনী সরাসরি সম্মুখ সমরে না গিয়ে গেরিলা পদ্ধতিতে
সুলতানি রসদ আগমনের পথটি বন্ধ করে দিল।
তারা পথের পাশে জঙ্গলের মধ্যে গাছের উপরে তক্কে
তক্কে থাকত। রসদ সংগ্রহকারীরা রসদ নিয়ে ফেরার সময় আক্রমণ করে লুট করে নিত
সমস্ত রসদ।
সুদীর্ঘ ছয় মাস অবরোধের পর বাহমনি
সেনারা যখন ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত, তখন গজপতির হস্তীবাহিনী কালবৈশাখীর ঝড়ের
মতো তাদের উপর ঝাঁপিয়ে
পড়ল। সুলতানি ফৌজ ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করতে বাধ্য হয়।
গজপতি কপিলেন্দ্রদেব বুঝেছিলেন যদি নিজের রাজ্য
সুরক্ষিত করতে হয় তা হলে আগ্রাসন নীতি নিতে হবে। তাই তিনি সরাসরি রাজধানী বিদারে গিয়ে আক্রমণ করলেন। কড়া
নাড়লেন বাহমনি সুলতানের দরজায়।
সুলতানি অশ্বারোহীরা খোলা প্রান্তরে
অপ্রতিরোধ্য ছিল, কিন্তু দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি ও পাথুরে জমিতে গজপতির
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতিগুলো
ছিল সাক্ষাৎ যম।
সিংহাসনে বসে গজপতি কপিলেন্দ্র দেব ভূমিসংস্কার করে
কৃষকদের রাজস্ব মকুব করে
তাদেরকে স্বাধীন ভূস্বামীর মর্যাদা দিয়েছিলেন। এমনকি
ভাগচাষিরাও ন্যায্য পাওনাগন্ডা পেত। এবং সেই বিষয়ে কোনও ফড়ে বা
দালাল নয়, রাজা স্বয়ং নিজের দায়িত্বে থাকা বিশেষ রক্ষীদের দ্বারা
দৃষ্টি রাখতেন। ফলে কৃষক সম্প্রদায়ের
তাঁর প্রতি এক অন্ধ আনুগত্য গড়ে উঠেছিল। আর এখান থেকেই
তৈরি হয়েছিল অপ্রতিরোধ্য পাইক বাহিনীর ভিত্তি। কৃষক ও যোদ্ধাদের নিয়ে
গঠিত এই পাইক বাহিনী জঙ্গল
ও জলাভূমিতে দীর্ঘকাল (তাঁর মারা যাওয়ার পরেও) অপরাজেয় ছিল।
রাজা কপিলেন্দ্র দেবের গুপ্তচর ব্যবস্থা এতটাই
উন্নত ছিল যে সুলতানি শিবিরের প্রতিটি পদক্ষেপ তিনি আগেভাগেই জেনে যেতেন।
সুলতানের চাবুক ঘোড়াগুলো সেদিন থমকে দাঁড়িয়েছিল মহানদীর
বীরদের হুংকারে। গঙ্গা
থেকে গোদাবরী— সবখানেই তখন ধ্বনিত হচ্ছিল প্রভু জগন্নাথের নাম।
পরাক্রমশালী
বাহমনি সুলতান বিদারের পতন আঁচ
করে সর্বসম্মত চুক্তিতে সম্মত হয়ে কোনওমতে সাম্রাজ্য রক্ষা করেন।
তবে কেবল স্থলযুদ্ধের কথা আলোচনা করলে তার
বীরত্ব ও কৌশলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হয়। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জনও সেকালে
গজপতির সেনাদলের রণভেরির গর্জনের আড়ালে চাপা পড়ে যেত।
বঙ্গদেশের যুদ্ধে যেমন ছোটো
ছিপ নৌকা দেখেছি, এমনই দাক্ষিণাত্যে বিশেষত বিজয়নগর আক্রমণের সময় তার নৌ-দক্ষতা
পরিলক্ষিত হল।
সামান্য ছিপ থেকে গজপতি নৌবাহিনীকে সুসংগঠিত এবং
প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করে তুলেছিলেন। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তাঁদের রণতরীগুলো কেবল
যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এক-একটি ভাসমান দুর্গ।
বিশাল আকৃতির জাহাজগুলোতে একসঙ্গে কয়েকশো সৈন্য এবং যুদ্ধের
রসদ বহন করা সম্ভব ছিল। তার উপর তাঁদের জাহাজগুলিতে কাঠের
ওপর ধাতুপাতের আস্তরণ থাকত, ফলে শত্রুর অগ্নিবাণ বা গোলার প্রাথমিক আঘাত সহজেই এড়িয়ে যেত।
কপিলেন্দ্র দেব বুঝেছিলেন, দক্ষিণ ভারতের সমৃদ্ধ বন্দরগুলো
নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সমুদ্র জয় করতে হবে। অন্ধ্র উপকূলের কন্দবিদু বা কোন্ডাপল্লি
অভিযানের সময় তিনি কেবল স্থলপথ নয়,
সমুদ্রপথেও অবরোধ তৈরি করেছিলেন। বিজয়নগর
সাম্রাজ্যের ব্যবসায়িক বন্দরগুলো তাঁর নৌবাহিনীর দখলে চলে আসায় শত্রুর আয় ও রসদের
পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এরপর বঙ্গোপসাগরে তৎকালীন সময়ে সক্রিয় জলদস্যুদের
দমন করে তিনি সমুদ্রপথ নিরাপদ করলেন,
যা পরবর্তী পূর্বভারতের বাণিজ্যের প্রসারে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
গজপতি কপিলেন্দ্র দেবের নৌবাহিনী তাঁর সাম্রাজ্যকে
কেবল সুরক্ষিতই করেনি, এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল।
সিংহল (শ্রীলঙ্কা) থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে ঔড্রদেশের
বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে এই নৌ-শক্তির অবদান ছিল অপরিসীম। তিনি প্রমাণ
করেছিলেন যে, ঔড্রদেশ কেবল মহানদীর তীরে সীমাবদ্ধ নয়, তা
প্রসারিত বঙ্গোপসাগরের দিগন্ত রেখা পর্যন্ত।
প্রভুর কাজ
গঙ্গাবংশের পর কপিলেন্দ্র দেব যখন সিংহাসনে বসেন, তখন
ঔড্রবক্ষে সুলতানি ঝড়ের চিহ্ন। লিঙ্গেশ্বর-সহ বহু মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছিল, সেবার
রীতিনীতিতে চরম। গজপতি তলোয়ারের জোরে রাজ্য জয়ের পাশাপাশি পরম মমতায় সংস্কার শুরু
করলেন তাঁর আরাধ্য দেবতার
মন্দিরের।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে গজপতি কপিলেন্দ্র দেবের
সবচেয়ে বড় অবদান হল পুরীর মন্দিরের নাটমণ্ডপ এবং ভোগমণ্ডপ-এর বর্তমান কাঠামোর সংস্কার
ও অলংকরণ।
তাঁর নির্দেশে মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা
হয়েছিল নিপুণ কারুকার্য, যা আজও পর্যটকদের বিস্মিত করে।
তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যাতে মন্দিরের ভিতরে
পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। এর জন্য শোনা যায় দক্ষিণ এশিয়া
থেকে তিনি বিশেষ কারিগর নিয়ে এসেছিলেন। যাদের বংশধররা আঙ্কোরভাটের মন্দির
সংস্কারের কাজ করতেন।
মন্দিরের নিরাপত্তাকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
মন্দিরের বাইরের দিকের প্রাচীর বা 'মেঘনাদ পাচেরি'
(Meghanada Pacheri)-র সংস্কার ও
শক্তিবৃদ্ধি করেন। এটি কেবল একটি দেওয়াল ছিল না, বরং বহিঃশত্রুর আক্রমণ
থেকে মন্দিরকে রক্ষা করার একটি দুর্গপ্রাকারও ছিল। তাই তার গঠন দুর্গপ্রাকারের
ন্যায়।
কেবল পাথর দিয়ে মন্দির গড়া যায় না, তার জন্য
দরকার সুশৃঙ্খল সেবা। তাই তিনি জগন্নাথ মন্দিরের সেবায়েতদের দায়িত্ব ও অধিকার সুনির্দিষ্ট
করে দিয়েছিলেন।
ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে,
মন্দিরের কাজে
ব্যবহৃত জমি বা সম্পদের উপর
কোনও রাজকীয় কর নেওয়া হবে না। এমনকি মন্দিরের সেবার জন্য তিনি অনেক সময়
নিজের ব্যক্তিগত কোষাগার থেকেও অঢেল অর্থ দান করতেন। সে-নিয়ম আজও একইভাবে চলছে।
আজ প্রায় ৫০০ বছর পরে মন্দিরের গায়ে জ্বলজ্বল করছে তার
খোদাই করা শিলালিপি—
"যদি
রাজকীয় ক্ষমতার দম্ভে আমি মন্দিরের
বা প্রজাদের কোনও ক্ষতি করি, তবে জগন্নাথ যেন
আমাকে দণ্ড দেন।"
সত্যিই তো, রাজার মুকুট যেদিন জগন্নাথের চরণে
লুটিয়ে পড়ল, সেদিন থেকেই মন্দির আর রাজপ্রাসাদের দূরত্ব ঘুচে গেল।
কপিলদেব শিখিয়েছিলেন, সত্যিকারের সংস্কার শুরু হয় ভক্তি আর মানুষের প্রতি সেবা
দিয়ে। আজকের ভোট সময়ের উত্তাল
ভারতবর্ষের কাছে এ বার্তা যে কতখানি প্রাসঙ্গিক তা বলে
বোঝানো যাবে না।
১৪৬৬
খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণা নদীর তীরে গজপতি গৌড়েশ্বর নবকোটী
কর্ণাট কলবর্গেশ্বর রাজা কপিলেন্দ্র দেবের জীবনাবসান ঘটে।
___________________________________________________________________________
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:
প্রথম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html
দ্বিতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html
তৃতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html
চতুর্থ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
পঞ্চম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
ষষ্ঠ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html
সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html
অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html
নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html
দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html
ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html
চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html
পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html
ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html
সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html
অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html
ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html
বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html
একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html
দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html
ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html
চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html
পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html
ষট্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html
সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html
অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html
ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html
ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html
একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html
