প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান
তমোঘ্ন নস্কর
দ্বিচত্বারিংশ পর্ব: রাজা পৃথু
আঁধার নেমে এসেছে অনেকক্ষণ। এই সময়টা অরণ্য জেগে ওঠে।
কিন্তু আজ সবই চুপচাপ, যেন ভীষণ এক অসনের প্রতীক্ষা করছে সে৷ এমনকি অন্য দিন
করতোয়া খলবল করতে করতে পাথরের গায়ে ধাক্কা মারতে মারতে এগিয়ে যায় অথচ আজ তার কোনও
সাড়া নেই! যেন জলপাইগুড়ির এই গহীন অরণ্যের বুক চিরে বয়ে চলা নদীটার জলও যেন
আতঙ্কে পা টিপে টিপে চলেছে।
রাজা পৃথু পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন দুর্গের
অলিন্দে। আচ্ছা তিনি কি চিন্তিত? কারণ যিনি আসছেন— তিনি বাংলা দখল করেছেন, নালন্দা
মহাবিহার ছারখার করেছেন। তাঁর সঙ্গে লক্ষাধিক সৈন্য। আর তিনি রাজা পৃথু, কোচ
জনজাতির এক ক্ষুদ্র রাজা। না ক্ষমতায়-সামর্থ্যে-সাহসে তিনি ক্ষুদ্র নন। কিন্তু
সংখ্যায় তাঁরা বড়ো কম। এত সহজে স্বাধীনতা হারানো যাবে না৷ মন্ত্রী শাহ হাজং
এসে দাঁড়ালেন রাজার পাশে, বিড়বিড় করে বললেন কিছু কথা! হাসি খেলে গেল রাজার
মুখে, তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল ভ্রু জোড়া, সে-দৃষ্টি দুশ্চিন্তার নয় বরং এক আদিম শিকারির
সজাগ দৃষ্টি।
কামরুপ রাজ্যের রাজা পৃথু’র আরাধ্যা স্বয়ং দেবী কামাখ্যা। বংশপরম্পরার দিক দিয়ে ধরলে
তাঁর বংশ দোর্দণ্ডপ্রতাপ নরকাসুরের রক্ত বহন করে আনছে। মায়ের স্নেহ স্পর্শে খেন
বংশকে কোনও শক্তিই পদানত করতে পারেনি। আজও নিশ্চয়ই মা কামতেশ্বরী তাঁদের সহায়
হবেন। এই দুর্ধর্ষ যবন দস্যুর হাত থেকে তাঁদেরকে রক্ষা করবেন। আর মা যদি ইচ্ছা
করেন তা হলে এই যবনের ঘোর পরিণতি হবে, তেমন নিয়তি কেউ কল্পনাতেও আনতে পারবে না...
***
তিব্বত অভিযানে পরাস্ত হওয়ার পর যেখানেই ছোটো ছোটো যা
জনজাতি দেখছেন, তাদেরকেই লুণ্ঠন করছেন বখতিয়ার। চেষ্টা করছেন তাদের সেই সামান্য
অসহায় সম্বলটুকু ছিনিয়ে নিয়ে নিজের ব্যাপক ক্ষতি শুধবার। কিন্তু অত বড়ো একটা
সেনা দলের পেট কি তাতে ভরা সম্ভব!
ক্ষুধার্ত, পরিশ্রান্ত তুর্কি ফৌজ হন্যে হয়ে পথ খুঁজছে একটু
ভরপেট খাবারের আশায়৷ এই রুক্ষ পাহাড়ি ভূমিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে তারা। হেন কালে তাদেরকে
গুপ্তচর খোঁজ দিল কামরূপ রাজ্যের কথা। মোটামুটি পাহাড় সমতল মিশিয়ে বেশ সুজলা, সুফলা
একটি দেশ। খাদ্য এবং প্রাচুর্যের কোনও অভাব হবে না। অন্তত তিন-চার মাসের রসদের
ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ব্যাস, কাজ ঘুরিয়ে তিনি চললেন কামরূপ অভিমুখে।
মোহাম্মদ ঘোরির দুর্ধর্ষ সেনাপতি আদৌ জানতেন না ভারতবর্ষের
চরিত্র। ঘোরির কথামতো তিনি রাজ্য দখল করতে নেমেছেন। নেমেছেন লুন্ঠন করতে... কিন্তু
ভারতবর্ষের চরিত্র ও তার জনজাতি সম্পর্কে অনেক জ্ঞান বাকি ছিল। তার প্রমাণ পরবর্তী
ঐতিহাসিক সংগ্রাম!
পৃথু জানতেন, সম্মুখ-সমরে বখতিয়ারের দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী
বাহিনীকে আটকানো কঠিন। তাই তিনি সাজালেন এক মায়াজাল।
বহুকাল পূর্বে কোনও এক ভারতশ্রেষ্ঠ বীর বলে গিয়েছিলেন, “শত্রুকে মারতে হলে সবসময় তরবারির দরকার হয়
না, মাঝেমধ্যে মানচিত্রও অস্ত্র হয়ে ওঠে।” রাজা পৃথু সেই কথা
অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে সচেষ্ট হয়ে উঠলেন।
***
পৃথু তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন— ঘাড়া নীতি পালনের অর্থাৎ
বখতিয়ারের সেনারা যে-পথ দিয়ে আসবে, তার দু’পাশের সমস্ত শস্য পুড়িয়ে ছারখার করে
দেওয়া হল। কুয়োর জলে মিশিয়ে দেওয়া হল বিষ। এর জন্য তিনি আগে থেকেই ব্যবস্থা
নিয়েছিলেন। দুর্গের মধ্যে গ্রামবাসীদেরকে তুলে এনে তাদেরকে সুরক্ষিত করেছিলেন এবং
রসদ মজুদ করে নিয়েছিলেন। রসদহীন খলজি বাহিনী যখন তৃষ্ণায় ছটফট করছে, ঠিক তখনই
শুরু হল আসল খেলা।
নেতা যতই সুদক্ষ এবং ধৈর্যশীল হোক— ক্ষুধা কিংবা লোভের উপর
তার হাত থাকে না। এই কারণেই বিভিন্ন বাহিনী জয় লাভের পর ব্যাপক লুঠতরাজ হয়। দিগ্বিজয়ী
আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর বাহিনীও একসময় ক্ষুধায় কাতর হয়ে এ দেশ ছাড়ার
সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ক্ষুধার মারটি-ই মারতে চাইলেন। খেতের পরে খেত কালো ধোঁয়া আর
ছাইয়ে আচ্ছন্ন দেখে তারা যেন উন্মাদ হয়ে উঠল।
দিশেহারা বখতিয়ার খলজি এসে উপস্থিত হলেন করতোয়ার প্রান্তে।
স্বচ্ছ করতোয়া নদীর উপরে বিশাল পাথরের সেতুটি ধরে মূল ভূখণ্ডে ফিরে আসতে
চেয়েছিলেন বখতিয়ার। আসলে এসবই ছিল টোপ, বখতিয়ারের বাহিনীকে ওই পথেই টেনে আনতে
চেয়েছিলেন তিনি। পৃথু সেখানেও বিছিয়ে রেখেছিলেন মরণফাঁদ। সেতুর দু’পাশে লুকিয়ে ছিল কামরূপের সেরা তিরন্দাজরা।
সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে, যখন ক্লান্ত বিধ্বস্ত খলজি বাহিনী
সেতুর উপর পা রেখেছে, অন্ধকারের বুক চিরে ধেয়ে এল হাজার হাজার বিষাক্ত তির।
চিৎকার, হাহাকার আর ঘোড়ার খুরের শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠল জলপাইগুড়ির কাছাকাছি
কোনও এক অখ্যাত নদীখাতে! শয়ে শয়ে মানুষ ঝাঁপ দিল জলে... আঁধারের বুকে...
এবার আস্তে আস্তে চারপাশ থেকে পদাতিক সৈন্যরা ঘিরে ধরতে
শুরু করলেন। কোচ সৈন্যরা ক্লান্ত নয়, ভরপেট খেয়েদেয়ে অপেক্ষা করছিল শিকারের। এখন
পূর্ণ উদ্যোমে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
***
রাজা পৃথুর কথা আমরা হয়তো খুব কমই জেনে থাকব। প্রাচীন
প্রাগজ্যোতিষপুরের ভূস্বামী সম্প্রদায় ছিল খেন বংশ। পাল বংশের শেষের দিকে যখন পাল
রাজারা দুর্বল হয়ে পড়ছেন তখন স্বাধীন রাজ্যের অধিকারী হন তাঁরা। উত্তরবঙ্গ এবং
আসামের বৃহত্তর অংশ নিয়ে তাঁদের রাজত্ব ছিল। খেন বংশ নিজেদেরকে কিংবদন্তি
নরকাসুরের সঙ্গে তুলনা করত। তাঁরা মা কামাখ্যার আশীর্বাদ ধন্য।
কোচবিহারের রাজা বিশ্বসিংহ ১৫২৪ খ্রিস্টাব্দে জলপাইগুড়ি
জেলার ময়নাগুড়ির জর্দা নদীর তীরে জল্পেশ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু মনে করা
হয় তার বহু পূর্বে রাজা পৃথু তাঁর যুদ্ধজয়কে নিবেদন করেছিলেন জল্পেশ্বর মহাদেবের
চরণ কমলে।
বখতিয়ার খলজি বাংলা দখল করার পর তিব্বতের অভিমুখে নিজের
সৈন্যদল নিয়ে যাত্রা করেছিলেন এবং সেখানে ভয়ানকভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর, তিনি
পুনরায় বাংলায় ফিরে আসতে চাইলে এখানেই তাকে ফাঁদে ফেলে পর্যুদস্ত করেছিলেন এই
কিংবদন্তি বীর। বর্তমানে আসামের
সরকার রাজা পৃথু’র কথা বলতে আগ্রহী হয়েছেন। আমরা সেই
আগ্রহের আগুনে একটুকু ঘৃতাহুতি দিলাম মাত্র।
___________________________________________________________________________
প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:
প্রথম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html
দ্বিতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html
তৃতীয় পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html
চতুর্থ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
পঞ্চম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html
ষষ্ঠ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html
সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html
অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html
নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html
একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html
দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html
ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html
চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html
পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html
ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html
সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html
অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html
ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html
বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html
একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html
দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html
ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html
চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html
পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html
ষট্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html
সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html
অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html
ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html
ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html
একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html
