প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান - তমোঘ্ন নস্কর

 

প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান

 

তমোঘ্ন নস্কর

 

 

ত্রয়শ্চত্বারিংশ পর্ব: চতুর্ভুজ

 

আজ সারাদিন যুদ্ধ চলেছে। লাগাতার চার মাসের অবরোধের পর, আজ চিতোরের প্রাকার ভেঙে পড়েছে। চিতোরের আকাশ বারুদ আর জ্বলন্ত লাক্ষা-চুনির ধোঁয়ায় কেমন একটা মরচে-পড়া তামাটে রং ধরেছে। বাতাস অস্বাভাবিক রকম ভারী, যেন নিশ্বাস নিলেই ফুসফুসে ঢুকে পড়বে, কারওর শেষ গোঙানি— হতে পারে সে কোনও রাজপুত স্বাধীনতা সংগ্রামী, হতে পারে সে কোনও মোঘল যুদ্ধব্যবসায়ী।

১৫৬৭ সালে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর উজবেক বিদ্রোহীদের দমন করে আকবর অনুভব করলেন— যদি সুদীর্ঘকাল এই ভারতবর্ষে রাজত্ব করতে হয়, তা হলে সমস্ত দেশীয় রাজাদেরকে আপন ছত্রছায়ায় নিতে হবে। তাই পিতৃপুরুষের মতো ভুল না করে তিনি দেশীয় হিন্দু রাজন্যবর্গের দিকে নজর দিলেন। যদিও ততদিনে অম্বরের রাণা বিহারী মল প্রমুখরা তাঁর দাসত্ব অস্বীকার করে নিয়েছিল। অবস্থানগত দিক দিয়ে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মেবার তাঁর প্রভুত্ব স্বীকার করেনি।

এদিকে মালুয়া এবং গুজরাটে যাওয়ার জন্য মেবার ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং মেবারের বিভিন্ন শাখাপথগুলি দক্ষিণাত্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার পক্ষেও সুরক্ষিত ও সুনিশ্চিত করে।

আকবর যুদ্ধযাত্রার আয়োজন করছিলেন কেবল, এই সময় তাঁর ইন্ধনে ঘৃতাহুতি দিল আফগান বিদ্রোহীদেরকে আশ্রয় দেওয়া। মেবারের রানা উদয় সিংহ বাজবাহাদুরকে নিজের দুর্গে আশ্রয় দিলে আকবরও ছুতো পেয়ে গেলেন মেবার আক্রমণ করার। সুবিশাল সৈন্যবাহিনী এবং সাঁজোয়া সাজিয়ে চিতোর দুর্গ অবরোধ করে বসলেন তিনি, সময়টা ২৩ অক্টোবর ১৫৬৭।

তারপর কেটে গেছে সুদীর্ঘ চারটি মাস। ইতিমধ্যে ভীত-সন্ত্রস্ত রানা উদয় সিংহ দুর্গের পিছন দিক দিয়ে সিংহভাগ সৈন্যসামন্ত নিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন তাঁর অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত অবস্থান উদয়পুরে।

সুদীর্ঘ চার মাস ধরে পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের সেই সুবিশাল মোগলাই অবরোধ সামলে চলেছেন জয়মাল্য রাঠোর-এর নেতৃত্বাধীন আট হাজার সৈন্যের একটি রাজপুত বাহিনী। তাদের সম্বল বলতে হাতেগোনা কয়েকটি কামান, হাওদা ও দেশি বন্দুক, তির-ধনুক-তরবারি আর অকুতোভয়তা।

 

***

দুর্গের প্রাকারটা যেখানে এসে খাড়া পাহাড়ের গায়ে মিশেছে, সেই গম্ভীর পাথুরে চাতালে দাঁড়িয়ে কল্লাজি রাঠোর এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুঝলেন। নীচে আরাবল্লির পাথুরে খাঁজগুলো হাঁ করে কামড় বসাতে চাইছে। প্রায় সাতশো ফুট উঁচুতে এই দুর্গ যেন এক একলা বাজপাখি, চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে আকবরের লক্ষাধিক মুঘল বাহিনী। কিন্তু বাজপাখি কি এত সহজে ডানা ছেড়ে দেয়?

 

***

আকবর দুর্গ অবরোধ করে প্রথমে কয়েকটি সরাসরি আক্রমণ সংগঠিত করেছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হন এবং রণনীতি পরিবর্তন করেন।

তিনি সরাসরি সাবিত বা সুড়ঙ্গ যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। প্রায় পাঁচ হাজার রাজমিস্ত্রি এবং সুড়ঙ্গ খোদককে কাজে লাগান তিনি।

দু’টি পরস্পর সমান্তরাল সুড়ঙ্গ খোলা হয় এবং সংযুক্ত করে একটি আক্রমণ মুখ প্রস্তুত করেন। এর জন্যে প্রায় ৫৮ দিন সময় লেগেছিল তাঁর। এই দিন তিনি নিয়মিত বাইরে থেকে সম্মুখ যুদ্ধ করে চলেছিলেন, আপাতদৃষ্টিতে আর পাঁচটা সাধারণ অবরোধের মতোই মনে হয়েছিল দেখে।

এর মধ্যে আশপাশে বিভিন্ন নগর এবং গ্রাম থেকে লৌহ সংগ্রহ করে ও খরিদ করে এনে ঢালাই করে বৃহৎ কামান তৈরি করছিল মুঘলরা।

৫৮ দিন পর শুরু হয় সেই ভয়াবহ সংগ্রাম। কিন্তু রাজপুতরাও ছেড়ে দেয়নি— সুড়ঙ্গগুলিতে তরল উত্তপ্ত তেল, লাক্ষা ঢেলে ও ভারী পাথর দিয়ে আটকে তাদের গতি রোধ করে দেয়। এমনটা হতে পারে অনুমান করেই সম্ভবত আকবর দূরপাল্লার ভারী কামানগুলো বানিয়েছিলেন। প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ভারী পাল্লার কামানগুলি ক্রমাগত অগ্নিবর্ষণ শুরু করে এবং ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখে সমস্ত অবরোধ ভেঙে পড়ে।

 

***

কিছু কিছু যুদ্ধ জেতার জন্য লড়া হয় না, কিছু যুদ্ধ লড়তে হয় শুধু আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকানোর সাহসের জন্য। কল্লাজি'র বয়স চব্বিশ কি পঁচিশ। ফাগের এই গোধূলিবেলায় মেবারের এক যুবতীর কানের দুল দুলিয়ে দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু আজ তাঁর ডান হাত আঁকড়ে ধরে আছে খাঁড়া, আর বাম কাঁধের উপর চেপে বসে আছেন জখম কাকা জয়মল্ল। চতুর্বাহু ভগবান বিষ্ণুর মতো চার হাতে তরোয়াল ঘুরছে বনবনিয়ে। রাজপুতানার লোকগাথা আজ ইতিহাস আর কল্পনার সীমান্তরেখা মুছে রক্ত দিয়ে নতুন মহাকাব্য লিখছে

আকবরের মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণে দুর্গের দেয়াল ধ্বসে গেলে, জয়মল্ল নেতৃত্বের বুরুজ থেকে নেমে এসে মেরামতিতে হাত লাগান। এবং দূরপাল্লার বন্দুকগুলো পালা করে গর্জে ওঠে। ভাঙা দেয়াল বেয়ে উঠে আসে শত শত মোগল সেনা।

জয়মল্ল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেন গুলির আঘাতে। উঠে দাঁড়ানোর মতো সাড় নেই পায়ে। কিন্তু তবুও এই রণক্ষেত্র ছেড়ে গেলেন না। তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন রানা। ভ্রাতুষ্পুত্রের দিকে তাকিয়ে জয়মল্ল বললেন তুমি কি আমাকে কাঁধে বহন করতে পারবে পুত্র? তা হলে এ লড়াইয়ের শেষ অবধি আমি দেখে যেতে পারতাম...

কল্লাজি মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম করে কাঁধে তুলে নিলেন কাকাকে। জয়মল্লের রক্তাক্ত ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল, সম্ভবত শেষ মুহূর্তের জন্য ইষ্টমন্ত্র জপলেন তিনি।

অগ্রগামী মুঘল বাহিনীর ঘোড়াটি প্রাকারের পাথরে খুর ঠুকল, কিন্তু ওইটুকুই... চারটে তরোয়াল একসঙ্গে বাতাস কেটে নামল। অগ্রগামী সৈনিকদের হাত, মুণ্ড ছিন্ন হল। তাঁরাও আঘাত পেলেন, ভারী তলোয়ার বারবার এসে লাগল কল্লাজির বর্মের উপর। স্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠল। কিন্তু দমাতে পারল কই?

ক্রমশ বিশাল মুঘল বাহিনীর স্রোত বাড়তে লাগল, তাঁদের ঠেলে নিয়ে এল খাদের কিনারায়। সামান্য পায়ের ভারসাম্য হারালেই সোজা সাতশো ফুট নীচে পাথরের বুকে আছড়ে পড়তে হবে। অথচ এমন একটি বিপজ্জনক ক্ষেত্রে দাঁড়িয়েও চারপাশে স্তূপ তৈরি করলেন কাকা-ভাইপো।

"তুমি মানুষ না, সৃষ্টিকর্তার পাঠানো কোনও অলৌকিক যোদ্ধা!" মুঘল সেনাপতির গলা দিয়ে ভয়ের চোরাস্রোত নেমে এল। চারটে হাত সমান গতিতে, কোনও ক্লান্তি ছাড়া তরোয়াল চালিয়ে তিন শতাধিক মৃতদেহের একটি মানুষ প্রাচীর গড়েছে দুর্গের ভাঙা প্রাচীরের স্থানে।

শেষ বিকেলের মরা আলো এসে পড়ল চিতোরের ভাঙা বুরুজের উপর। হাওদা বন্দুকের সীসা বিদ্ধ করল জয়মল্লকে।

ইস্পাতের বর্ম ভেদ করে মেবারের মাটি ছুঁয়ে প্রণাম করল তাঁর রক্ত আহুতি। প্রাণহীন দেহটা প্রাকারের উপর আছড়ে পড়ল, কিন্তু তাঁর চোখ দুটো খোলাই রইল... শেষ মুহূর্ত অব্দি প্রতিশ্রুতি পালন করে গেলেন তিনি

কল্লাজি হাঁপাচ্ছিলেন। তাঁর নিজের শরীর থেকেও রক্ত ঝরছে। কিন্তু তিনি থামলে চলবে না। কাকা মারা যাওয়ার পর এমনিতেই সেনাদের মনোবল ভেঙে গিয়েছে। এখন সেই রণক্ষেত্র ছাড়লে দুর্গরক্ষা অসম্ভব হবে। সদম্ভে আকবরের মূল শিবিরের দিকে তাকিয়ে তরোয়াল দুটো উঁচিয়ে ধরলেন।

রণকুশল, প্রাজ্ঞ মুঘল ধুরন্ধর বন্দুক নামিয়ে নিতে বললেন। এ বীর পিছন থেকে বন্দুকের গুলি খেয়ে মরার জন্য নয় বরং নিজের শেষ নিশ্বাস অবধি লড়াই করে যাক। এইটুকু সম্মান এই বীরের প্রাপ্য। এই প্রাপ্যটুকু না দিলে ইতিহাস আকবরকে হীনজ্ঞান করবে

আর কল্লাজি তিনিও জানতেন এই যুদ্ধটার শেষ কোথায়। তিনি দেখতে পাচ্ছেন, তার পিছনে আস্তে আস্তে এসে দাঁড়াচ্ছে পুর-নারীরা— তাদের হাতে তলোয়ার, চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন। ওই তো তাঁর মা, তাঁর স্ত্রী, তাঁর বোন... জয় অলীক, কিন্তু লড়াইটা চিরন্তন

সে-রাতে দুর্গের বিভিন্ন স্থানে জহর ব্রত পালন হল। এলোমেলো দখিনা বাতাস আগুনকে উসকে দিয়ে তাদের কষ্ট লাঘব করল খানিক।

পরদিন ছিল হোলি। অবশিষ্ট সৈনিকরা মনের মতো করে আবির খেলে গৈরিক বস্ত্র পরে অন্তিম বলিদানের জন্য বেরিয়ে এলেন অস্ত্র হাতে। হাঁ করে খোলা রইল দুর্গের দরজা, তাঁরা জানেন তাঁরা আর ফিরতে পারবেন না।

 

***

রাত নেমেছে পাহাড়ে। চিতোরের প্রাকারে আবিরের গন্ধমাখা বাতাস তখনবইছে। তবে তাতে এখন আর শুধু বারুদের গন্ধ ছিল না, মিশে ছিল এক অমর স্পর্ধার গল্প

সম্রাট আকবর কেল্লার দরজায় খোদাই করালেন দুই নাম— কল্লাজি আর জয়মল্ল।


___________________________________________________________________________


প্রতিরোধে বীর ভারত-সন্তান ধারাবাহিকটির আগের পর্বগুলি পড়ুন:

প্রথম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post.html

দ্বিতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_13.html

তৃতীয় পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_20.html

চতুর্থ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

পঞ্চম পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/06/blog-post_24.html

ষষ্ঠ পর্ব:  https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post.html 

সপ্তম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_12.html

অষ্টম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_19.html

নবম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

দশম পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/07/blog-post_27.html

একাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_88.html

দ্বাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_15.html

ত্রয়োদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_24.html

চতুর্দশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/08/blog-post_30.html

পঞ্চদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post.html

ষোড়শ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_13.html

সপ্তদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/09/blog-post_20.html

অষ্টাদশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_11.html

ঊনবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/10/blog-post_25.html

বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post.html

একবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_8.html 

দ্বাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_16.html

ত্রয়োবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_22.html

চতুর্বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/11/blog-post_29.html

পঞ্চবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post.html

ষট্‌বিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_14.html

সপ্তবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_22.html

অষ্টাবিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2025/12/blog-post_28.html

ঊনত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post.html

ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/01/blog-post_17.html

একত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post.html

দ্বাত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post_14.html

ত্রয়োত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/02/blog-post_22.html

চতূস্ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/03/blog-post_2.html

পঞ্চত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/03/blog-post_15.html

ষট্ত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/03/blog-post_29.html

সপ্তত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/04/blog-post.html

অষ্টত্রিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/04/blog-post_12.html

ঊনচত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/04/blog-post_19.html

চত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/04/blog-post_26.html

একচত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/05/blog-post.html

দ্বিচত্বারিংশ পর্ব: https://blogs.antareep.in/2026/05/blog-post_17.html

 

 

 

মন্তব্যসমূহ